
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে জনপ্রিয় অভিনেতা ধনুশের রাজনীতিতে যোগ দেওয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর ভক্ত সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে জনকল্যাণমূলক সংগঠন হিসেবে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পর এ জল্পনা সামনে আসে। তবে রাজনীতিতে প্রবেশের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ঘোষণা দেননি এই অভিনেতা।
তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) ধনুশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অভিষেক নিয়ে আলোচনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। দলটির মতে, অভিনেতা থেকে রাজনীতিক এবং পরে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া জোসেফ বিজয়ের যাত্রা নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে আগ্রহীদের অনুপ্রাণিত করছে।
টিভিকের মুখপাত্র এম সত্য কুমার এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁদের দলের রাজনৈতিক যাত্রা অন্যদের রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করছে—এটি তাঁদের জন্য আনন্দের বিষয়।
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে টিভিকে একটি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে, এতে আমরা খুশি।’
তবে সত্য কুমারের মতে, শুধু জনপ্রিয়তা দিয়ে রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক সাংগঠনিক কাজ, জনসম্পৃক্ততা এবং পূর্ণকালীন অঙ্গীকার।
কোয়েম্বাটোরে ধনুশের ভক্ত সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে ‘ধনুশ নরপানি ইয়াক্কাম’ রাখা হয়েছে। তামিল ভাষার এই নামের অর্থ ‘ধনুশ কল্যাণ আন্দোলন’।
নাম পরিবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত সভায় সংগঠনটির প্রায় তিন হাজার পদধারী অংশ নেন। সেখানে সংগঠনের শৃঙ্খলা, জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সভায় ধনুশ উপস্থিত ছিলেন না।
অনুষ্ঠানে সাবেক সাংবাদিক ও এআইএডিএমকে দলের সংসদ সদস্য রবি বার্নার্ড বক্তব্য দেন। এ ছাড়া ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর একজন বিজ্ঞানীও অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন।
সংগঠনটির এই পুনর্গঠনকে ঘিরে ধনুশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও, এটিকে তাঁর রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে অভিনেতা জোসেফ বিজয়ের উত্থান সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। চলচ্চিত্রজগতে দীর্ঘদিন জনপ্রিয় থাকার পর তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং নিজের দল টিভিকেকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক কার্যক্রম গড়ে তোলেন।
সত্য কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রার পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের প্রস্তুতি। তাঁর দাবি, প্রায় ৩০ বছর ধরে সংগঠন গড়ে তোলা ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন বিজয়।
সত্য কুমার বলেন, ‘বিজয় এর জন্য ৩০ বছর কাজ করেছেন। এটি সহজ নয়।’
তাঁর মতে, নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা সম্ভব হলেও নির্বাচনে সাফল্য অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হলে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
বিজয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বিজয় তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন।’
এর মাধ্যমে রাজনীতিতে পূর্ণকালীন মনোযোগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গীকারের বিষয়টি তুলে ধরেন টিভিকের এই মুখপাত্র।
ধনুশের ভক্ত সংগঠনের পুনর্গঠনের সঙ্গে বিজয়ের আগের সাংগঠনিক উদ্যোগের কিছু মিল রয়েছে।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে বিজয় তাঁর ভক্তদের সংগঠনকে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। ওই সংগঠনের সদস্যরা বিনা মূল্যে খাবার বিতরণ, পাঠাগার স্থাপন এবং আইনি সহায়তা দেওয়ার মতো কার্যক্রমে অংশ নিতেন। পরে এই নেটওয়ার্ক টিভিকের সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে।
টিভিকের মুখপাত্রের দাবি, ভক্তদের একটি ক্লাব হিসেবে যাত্রা শুরু করা সংগঠনকে বিজয় দীর্ঘ সময় ধরে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শক্তিশালী করেছেন। কঠিন সময়েও তাঁর পাশে থাকা ভক্ত সংগঠনের কয়েকজন সাধারণ সদস্য পরে মন্ত্রী হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে বিজয়ের অনুসৃত কৌশল অন্য কোনো অভিনেতার পক্ষে একইভাবে অনুসরণ করা সহজ হবে না বলে মনে করেন সত্য কুমার।
ধনুশের সংগঠনও এখন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে চলচ্চিত্র ও রাজনীতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রাজ্যটির রাজনীতিতে জনপ্রিয় অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
চিত্রনাট্যকার ও রাজনীতিক সি এন আন্নাদুরাই এবং এম করুণানিধি দ্রাবিড় রাজনীতির বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। অন্যদিকে চলচ্চিত্র তারকা এম জি রামচন্দ্রন ও জে জয়ললিতা মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা সব সময় রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ নেয়নি। শিবাজি গণেশন, বিজয়কান্ত, শরৎকুমার ও কমল হাসানের মতো তারকারা রাজনীতিতে এলেও মুখ্যমন্ত্রীর পদে পৌঁছাতে পারেননি। সুপারস্টার রজনীকান্তও একসময় রাজনীতিতে প্রবেশের পরিকল্পনা করলেও শেষ পর্যন্ত তা থেকে সরে দাঁড়ান।
এ প্রেক্ষাপটে বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান চলচ্চিত্র তারকাদের রাজনীতিতে প্রবেশ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
ধনুশের ভক্ত সংগঠনের নাম পরিবর্তন এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রাকে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে তুলে ধরায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত ধনুশ নিজে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি। তাঁর ভক্ত সংগঠনের পুনর্গঠনকে আপাতত সাংগঠনিক উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন, জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ধনুশের ভক্ত সংগঠন কি ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক ভূমিকার দিকে এগোবে, নাকি এটি সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে অভিনেতার নিজের অবস্থান জানার অপেক্ষা করতে হবে।