ভারতের নবজাগরণের পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়: এক অবিনশ্বর সমাজ সংস্কারকের জীবনগাথা
লুইস দারু | বিশেষ ফিচার ও সংস্কৃতি ডেস্ক, টাচবাংলাদেশ
বাঙালি ও ভারতীয় সমাজ যখন মধ্যযুগীয় অন্ধ সংস্কার, ধর্মীয় কুসংস্কার আর অমানবিক প্রথার বেড়াজালে বন্দী ছিল, তখন এক আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তাকে অবলীলায় বলা হয় ‘ভারতের নবজাগরণের পথিকৃৎ’। আধুনিক ভারতের রূপকার এই মহান মনীষীর জীবন, দর্শন এবং সমাজ সংস্কারের কালজয়ী ইতিহাস আজকেও আমাদের সমানভাবে অনুপ্রাণিত করে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়:
১৭৭২ সালের ২২ মে বাংলার হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রামমোহন রায়। তাঁর পিতা রামকান্ত রায় ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন প্রভাবশালী জমিদার। পারিবারিক আভিজাত্যের চেয়েও রামমোহনের মেধা ও জ্ঞানপিপাসা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তরুণ বয়স থেকেই তিনি বহুভাষাবিদ হয়ে ওঠেন এবং বিভিন্ন ধর্মের মূল দর্শন নিয়ে গভীর পড়াশোনা শুরু করেন।
সমাজ সংস্কার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম:
রামমোহন রায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি ছিল হিন্দু সমাজের অবক্ষয় ও অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থাকে কাঁপিয়ে দিয়ে তিনি যে সব ক্ষেত্রে অবদান রাখেন:
সতীদাহ প্রথা বিলোপ: স্বামীর চিতায় জীবন্ত স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংস ‘সতীদাহ প্রথা’ বন্ধে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর তীব্র আন্দোলনের মুখে এবং তৎকালীন লর্ড বেন্টিঙ্কের সক্রিয় সহযোগিতায় ১৮২৯ সালে এই অমানবিক প্রথা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয়।
নারীর অধিকার ও শিক্ষা: তিনি শুধু সতীদাহ প্রথাই বন্ধ করেননি, বরং বাল্যবিবাহের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং সমাজে নারী শিক্ষার প্রসার ও বিধবা বিবাহের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন।
একেশ্বরবাদ ও ব্রাহ্ম ধর্ম: ধর্মীয় কুসংস্কারের মূলে আঘাত করে তিনি একেশ্বরবাদ প্রচার করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট তিনি ‘ব্রাহ্ম সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে ব্রাহ্ম সমাজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
সাহিত্য ও শিক্ষা বিস্তার:
রামমোহন রায় বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর রচিত প্রধান গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—তুহফাত-উল-মুওয়াহহিদিন, বেদান্তসার এবং প্রথম বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ গৌড়ীয় ব্যাকরণ।
তাঁর জীবনের মূল দর্শনই ছিল মুক্তচিন্তার বিকাশ। যেমনটি আমরা দেখতে পাই তাঁর সেই চিরন্তন অমিয় বাণীতে— “জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই মুক্তি”।
বিলাত যাত্রা ও শেষ জীবন:
১৮৩০ সালে রাজা রামমোহন রায় ইংল্যান্ড গমন করেন। তাঁর এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল সতীদাহ বিলোপ আইন যেন কোনোভাবেই বাতিল না হয় তার পক্ষে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সমর্থন আদায় করা এবং ভারতীয়দের অধিকার ও স্বাধিকার বিষয়ে আলোচনা করা। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়েই ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টল শহরে এই মহান সংস্কারক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজকের প্রগতিশীল সমাজের যে ভিত্তি, তা বহুলাংশে রাজা রামমোহন রায়ের মতো দূরদর্শী মানুষেরই অবদান। অন্ধকারের বুক চিরে আলোর পথ দেখানো এই মহামানব চিরকাল ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবেন।