
বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছ চাষের পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নমুনা সংগ্রহ করা ২৫টি পুকুরের প্রতিটির তলদেশের পলিতে রয়েছে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করেও পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব। এতে মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশের নদী, সমুদ্র ও ইলিশ মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল। তবে মাছ চাষের পুকুরের পলি ও মাছের মধ্যে এই দূষণের উপস্থিতি এবং এর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে এ ধরনের সমন্বিত গবেষণা দেশে প্রথম বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা।
গবেষণাটির শিরোনাম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার: এভিডেন্স অব সেডিমেন্ট–ফিশ ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ইকোলজিক্যাল রিস্ক ইন বাংলাদেশ’। চলতি মাসে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন-এ এটি প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক বদিউজ্জামান খানের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। শীতকালে ত্রিশালের ২৫টি মাছের খামার থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান জানান, পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করাই ছিল গবেষণার মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি মাছের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এসব কণা গ্রহণের সম্পর্ক, প্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। প্লাস্টিকের ব্যাগ, মোড়ক, দড়ি, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য বর্জ্য ভেঙে এসব ক্ষুদ্র কণা তৈরি হয়। পরে তা মাটি, পানি ও জলজ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ত্রিশালের ২৫টি পুকুরের তলদেশের পলিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ১১ দশমিক ০৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। পলিউশন লোড ইনডেক্স বা দূষণভার সূচকের মান পাওয়া গেছে ১ থেকে ৪ দশমিক ৫-এর মধ্যে। এই সূচকের ভিত্তিতে অধিকাংশ পুকুরের তলদেশকে মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার দূষণযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, প্রবহমান নদীর তুলনায় পুকুরে পানির বিনিময় সীমিত হওয়ায় তলদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক দীর্ঘ সময় জমে থাকতে পারে। ফলে তলদেশে খাবার খোঁজা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর এসব কণা গ্রহণের ঝুঁকি বাড়ে। তবে মাছের প্রজাতি, খাদ্যাভ্যাস ও পুকুরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে কণা গ্রহণের মাত্রায় পার্থক্য হতে পারে।
গবেষণার অংশ হিসেবে ছয় প্রজাতির মোট ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করে ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি মাছে গড়ে কণার সংখ্যা শূন্য দশমিক ৬০টি। প্রজাতিভেদে এই সংখ্যা ছিল ভিন্ন। সরপুঁটি মাছে প্রতিটি মাছে গড়ে ১ দশমিক ২০টি কণা পাওয়া গেছে। রুই ও মৃগেল মাছে এই গড় ছিল শূন্য দশমিক ৬৮টি। অন্যদিকে কাতলা, কমন কার্প ও পাঙাশ মাছে তুলনামূলক কম কণা পাওয়া গেছে।
মাছের বসবাসের স্তর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শনাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের ৫২ শতাংশ পাওয়া গেছে তলদেশে বসবাসকারী মাছের মধ্যে। মধ্যবর্তী স্তরের মাছের ক্ষেত্রে এই হার ৩৫ শতাংশ এবং উপরিভাগে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ।
অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান বলেন, মাছকে প্রচুর পরিমাণে ফিড খাওয়ানো হয়। সব ফিড খারাপ নয়, তবে কিছু ফিডে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে। এ ছাড়া বন্যার পানির মাধ্যমেও অন্য এলাকা থেকে এসব ক্ষুদ্র কণা পুকুরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষণায় মূলত মাছের পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় প্রধানত পলিথিন বা পিই এবং পলিপ্রপিলিন বা পিপি পলিমার শনাক্ত হয়েছে। পলিথিন সাধারণত প্লাস্টিকের ব্যাগ ও প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে পলিপ্রপিলিন ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন পাত্র, দড়ি ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরিতে।
গবেষকদের ধারণা, মাছের খাদ্য, প্লাস্টিকের বস্তা ও মোড়ক, মাছ ধরার সরঞ্জাম, পানির পাইপ এবং গৃহস্থালি বর্জ্য এসব কণার সম্ভাব্য উৎস হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট উৎস শনাক্ত করতে আরও পৃথকভাবে নমুনা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ত্রিশাল উপজেলায় প্রায় ২২ হাজার পুকুরে মাছ চাষ হয়। এসব পুকুরে বছরে মাছ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৭২ হাজার মেট্রিক টন। ফলে এই অঞ্চলের মাছ চাষে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মৎস্যসম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ত্রিশালের জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহানা নাজনীন জানান, মাছের পুকুরের পাশে পোলট্রি খামার থাকলেও দূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। একটি পুকুরের পাশ থেকে মুরগির খামারও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
গবেষকদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে পরিবেশের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ঘাটতির কারণে এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। মানুষের শরীরেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তাই মাছের মাধ্যমে এসব কণা মানুষের শরীরে প্রবেশের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকযুক্ত মাছ খাওয়ার ফলে মানুষের যকৃত ও কিডনির ক্ষতি কতটা হতে পারে, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। গবেষকেরা মনে করছেন, মাছ চাষের পুকুরে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ মাছের খাদ্য নিশ্চিত করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। এতে জলজ পরিবেশের দূষণ কমানোর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা মিলতে পারে।