বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল পেকে যাওয়া স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। তবে অনেকের ক্ষেত্রে অল্প বয়সেই চুলে পাক ধরতে দেখা যায়। বংশগত বৈশিষ্ট্য এর অন্যতম কারণ হলেও শরীরে নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিও চুলের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
চুলের স্বাভাবিক রং নির্ভর করে মেলানিন নামের এক ধরনের রঞ্জক পদার্থের ওপর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুলের ফলিকলে মেলানিন উৎপাদন কমে যায়। ফলে চুল ধীরে ধীরে সাদা বা ধূসর হতে শুরু করে। এ ছাড়া বংশগত কারণ, ভিটামিনের ঘাটতি এবং কিছু শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও অল্প বয়সে চুল পাকার সম্পর্ক থাকতে পারে।
পুষ্টিকর ও সুষম খাবার চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে প্রোটিন, ভিটামিন বি১২, আয়রন, জিঙ্ক ও তামার মতো পুষ্টি উপাদান চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং রং বজায় রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন এমন সাতটি খাবার।
চুলের অন্যতম প্রধান উপাদান প্রোটিন। ডিমে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন বি১২ এবং বায়োটিন। এসব পুষ্টি উপাদান চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সুস্থতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। শরীরে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে তা চুলের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
কুমড়োর বীজ, সূর্যমুখীর বীজ এবং কালো তিলে রয়েছে বিভিন্ন খনিজ উপাদান, যার মধ্যে জিঙ্ক ও তামা উল্লেখযোগ্য। এসব উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি চুলের স্বাস্থ্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিমিত পরিমাণে এসব বীজ নিয়মিত খাবারের সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে। তবে এগুলো খেলেই চুল পাকা বন্ধ হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
দুধ ও দই প্রোটিন এবং ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। দুধ ও দুগ্ধজাত কিছু খাবারে ভিটামিন বি১২-ও পাওয়া যায়। এই ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে চুলের স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে।
চিনি ছাড়া দই কিংবা পরিমিত পরিমাণে দুধ দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে চুল পাকার নির্দিষ্ট চিকিৎসা হিসেবে এসব খাবারকে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
আমলকিতে রয়েছে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ভিটামিন সি শরীরে আয়রন শোষণে সাহায্য করে এবং কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে কাঁচা আমলকি কিংবা চিনি ছাড়া আমলকির রস খাওয়া যেতে পারে। তবে আমলকি সরাসরি মেলানিন উৎপাদন বাড়িয়ে সাদা চুল কালো করে দেয়—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ডালিমে রয়েছে ভিটামিন সি, ফোলেট এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান। এসব পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ডালিম নিয়মিত ফল হিসেবে খেলে সামগ্রিক পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা হতে পারে। তবে ডালিম খেলে অকালে চুল পাকা বন্ধ হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
পালং শাকে রয়েছে আয়রন, ফোলেট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি চুলের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
তাই সুষম খাদ্যতালিকায় পালং শাকসহ অন্যান্য সবুজ শাকসবজি রাখা উপকারী। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়রনের ঘাটতি ধরে নিয়ে অতিরিক্ত আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
আখরোটে রয়েছে স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান। এসব পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে।
পরিমিত পরিমাণে আখরোট খেলে দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আখরোট খেলে চুলের স্বাভাবিক রং ফিরে আসে বা চুল পাকা বন্ধ হয়—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
চুল পাকা পুরোপুরি ঠেকানোর কোনো নিশ্চিত খাদ্যভিত্তিক উপায় এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে এটি বংশগত কারণে হয়ে থাকে। তবে শরীরে ভিটামিন বি১২, আয়রন বা অন্য কোনো পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে তার যথাযথ চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
অল্প বয়সে হঠাৎ করে চুল পাকার পরিমাণ বেড়ে গেলে, বিশেষ করে এর সঙ্গে অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক পরীক্ষা করে পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে কি না, তা নির্ণয় করতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু একটি বা দুটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা। পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাওয়াই এ ক্ষেত্রে ভালো অভ্যাস।