
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনসহ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, হামলা ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগসহ নয়টি বিষয় নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরেছে দলটি। পাশাপাশি তিনটি দাবি জানিয়েছে তারা।
আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ নির্বাচন ঘিরে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। দলটির অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থী নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠক করেন জামায়াতের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ সময় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ও নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেনসহ অন্য নেতারা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে প্রশাসন, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণে নিরপেক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের এ নেতা জানান, শনিবার দলটির একটি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে নির্বাচনি এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সমর্থনে ছবি, আহত ব্যক্তিদের ছবি এবং নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাইরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একজন প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তুলেছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, ওই কর্মকর্তা রাতে প্রার্থীর বাড়িতে বৈঠক করেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণার মতো পোস্ট দিয়েছেন।
এ ছাড়া নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, টাকা লেনদেন এবং ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও করেছে জামায়াত। এসব অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়নি বলে দাবি করেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করাও সম্ভব হয়নি।
নির্বাচনি এলাকায় জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, এসব ঘটনায় নারী ও পুরুষ আহত হয়েছেন। কিন্তু পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
এ ছাড়া মসজিদের ভেতরে ধানের শীষের প্রার্থীর নির্বাচনি সভা আয়োজন, আচরণবিধি লঙ্ঘন করে রঙিন প্রতীক ব্যবহার এবং নির্ধারিত সময়ের আগে মাইক বাজানোর অভিযোগও তুলেছে দলটি।
হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করে জামায়াতের এ নেতা বলেন, সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষকদের মধ্যেও হিন্দু ভোটারদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে তাঁরা তথ্য পেয়েছেন।
একই সঙ্গে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ইউনিয়নে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য মেডিকেল ক্যাম্প বসানোর অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর দাবি, এসব কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়ালেই হবে না; দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে।
১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সতর্ক করে বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচনকে একই ধরনের পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়া হলে তার পরিণতি সম্পর্কে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে এমন কোনো দৃঢ় পদক্ষেপের আশ্বাস পাওয়া যায়নি, যা তাঁদের উদ্বেগ দূর করতে পারে। তবে এসব অভিযোগের পরও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি জামায়াত। দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছে এবং সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।
বৈঠক শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আচরণ ও কার্যক্রমে তাঁরা নিরপেক্ষতার প্রতিফলন দেখতে পাননি।
নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকায় ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটের পরিবেশ, প্রশাসনের ভূমিকা এবং নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ভোটের আগে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও কার্যকর পদক্ষেপের বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।