
নিজের জমি বা পুরোনো বাড়ি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছে দিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের চুক্তি করেন অনেক জমির মালিক। বিনিময়ে তাঁরা সাইনিং মানি, নির্মাণ চলাকালে বাড়িভাড়া সুবিধা এবং ভবন তৈরি হলে নির্দিষ্টসংখ্যক ফ্ল্যাট পান। তবে এসব সুবিধার ওপর কীভাবে আয়কর হিসাব হবে এবং কোন আয়বর্ষের রিটার্নে তা দেখাতে হবে, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আয়কর পরিপত্রে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, ডেভেলপারের সঙ্গে উন্নয়ন চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া সাইনিং মানি, বাড়িভাড়া সুবিধা ও ফ্ল্যাটের মূল্য মূলধনি মুনাফা হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এসব সুবিধার মূল্য এবং প্রযোজ্য কর রিটার্নে সঠিকভাবে দেখানো গুরুত্বপূর্ণ।
তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ধরা যাক, একজন জমির মালিকের জমি বা বাড়ির প্রকৃত অর্জনমূল্য ৬০ লাখ টাকা। তিনি ২০২৫-২৬ আয়বর্ষে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উন্নয়ন চুক্তি করলেন।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম বছরে তিনি এক কোটি টাকা সাইনিং মানি এবং অস্থায়ী আবাসনের জন্য তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা বাড়িভাড়া সুবিধা পেলেন।
উদাহরণ অনুযায়ী, সাইনিং মানি থেকে ১৫ শতাংশ হারে ১৫ লাখ টাকা উৎসে কর হিসেবে কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। বাড়িভাড়া সুবিধার বিপরীতে একই হারে করের পরিমাণ ৫৪ হাজার টাকা।
এ ক্ষেত্রে প্রাপ্ত সুবিধার হিসাব সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের রিটার্নে যথাযথভাবে দেখাতে হবে। একই সঙ্গে উৎসে কর বা অগ্রিম কর পরিশোধের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে পরবর্তী সময়ে কর সমন্বয় করা যায়।
২০২৬-২৭ আয়বর্ষে ভবন নির্মাণের কাজ চলতে থাকল। এ বছর জমির মালিক নতুন করে সাইনিং মানি বা ফ্ল্যাট পেলেন না। তবে চুক্তি অনুযায়ী, তিনি আরও তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা বাড়িভাড়া সুবিধা পেলেন।
পরিপত্রের উদাহরণে এ সুবিধাকেও মূলধনি মুনাফার হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৫ শতাংশ হারে এর বিপরীতে করের পরিমাণ ৫৪ হাজার টাকা।
অর্থাৎ, কোনো আয়বর্ষে শুধু বাড়িভাড়া সুবিধা পেলেও সেটির হিসাব রিটার্নে যথাযথভাবে দেখাতে হবে। পরিশোধিত করের প্রমাণপত্রও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
২০২৭-২৮ আয়বর্ষে ভবন নির্মাণ শেষ হলো। চুক্তি অনুযায়ী, জমির মালিক চারটি ফ্ল্যাট বুঝে পেলেন। ফ্ল্যাটগুলোর তৎকালীন মোট বাজারমূল্য ধরা হয়েছে দুই কোটি টাকা।
এ পর্যায়ে পুরো প্রকল্পের মাধ্যমে পাওয়া সুবিধাগুলোর মূল্য একত্র করে মূলধনি মুনাফার হিসাব করা হয়েছে। উদাহরণ অনুযায়ী, জমির মালিকের মোট প্রাপ্তি হবে—
সব মিলিয়ে মোট প্রাপ্ত সুবিধার মূল্য দাঁড়ায় ৩ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর থেকে জমি বা বাড়ির প্রকৃত অর্জনমূল্য ৬০ লাখ টাকা বাদ দিলে নিট মূলধনি মুনাফা দাঁড়ায় ২ কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার টাকা।
উদাহরণে নিট মূলধনি মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর হিসাব করা হয়েছে। সে হিসাবে মোট করের পরিমাণ ৩৭ লাখ ৮ হাজার টাকা।
তবে আগের বছরগুলোতে পরিশোধিত কর সমন্বয়ের সুযোগ থাকলে পুরো অর্থ নতুন করে দিতে হবে না। উদাহরণে প্রথম বছরে সাইনিং মানি থেকে উৎসে কাটা ১৫ লাখ টাকা এবং দুই বছরে বাড়িভাড়া সুবিধার বিপরীতে পরিশোধিত মোট এক লাখ আট হাজার টাকা বাদ দেওয়া হয়েছে।
এরপর অবশিষ্ট করের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১ লাখ টাকা।
উদাহরণে অবশিষ্ট ২১ লাখ টাকা একবারে পরিশোধের পাশাপাশি নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তিনটি সমান বার্ষিক কিস্তিতে দেওয়ার সুযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি বছর সাত লাখ টাকা করে পরিশোধ করতে হবে।
তবে কিস্তিতে কর দেওয়ার সুযোগ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন।
ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উন্নয়ন চুক্তি করলে শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে জমি বা বাড়ির প্রকৃত অর্জনমূল্যের প্রমাণ, উন্নয়ন চুক্তিপত্র, সাইনিং মানি পাওয়ার নথি, বাড়িভাড়া সুবিধার হিসাব, ফ্ল্যাটের মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত তথ্য এবং উৎসে কর জমার সনদ।
এ ছাড়া কোন আয়বর্ষে কী পরিমাণ সুবিধা পাওয়া গেছে, তার আলাদা হিসাব রাখা উচিত। এতে রিটার্ন দাখিলের সময় ভুলের ঝুঁকি কমবে এবং আগের পরিশোধিত কর সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও সুবিধা হবে।
গুরুত্বপূর্ণ: এখানে দেওয়া করের অঙ্ক ও হিসাব পরিপত্রে বর্ণিত উদাহরণ অনুসারে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাস্তবে করদায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আয়কর আইন, প্রযোজ্য বিধান, সম্পত্তির অর্জনমূল্য এবং কর পরিশোধের নথি যাচাই করে নেওয়া উচিত।