
পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চারকারী রাসায়নিক উপাদানগুলো সম্ভবত ধূমকেতু থেকে আসেনি। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা ছিল যে, সৃষ্টির আদিলগ্নে পৃথিবীর প্রথম ১০০ কোটি বছরে ধূমকেতুর আঘাতেই প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদানগুলো এখানে এসেছিল। কিন্তু 'সায়েন্টিফিক রিপোর্টস' (Scientific Reports) জার্নালে ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা এই ধারণাকে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। নতুন সিমুলেশন মডেল বলছে, বেশিরভাগ ধূমকেতুই এত প্রবল গতিতে এবং এত খাড়া কোণে পৃথিবীতে আঘাত হেনেছিল যে, সেই ভয়াবহ সংঘর্ষের ফলে প্রাণের উদ্ভবকারী 'প্রিবায়োটিক' অণুগুলোর টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব ছিল।
যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের (Met Office) গ্রহ বিজ্ঞানী রিচার্ড আনস্লো এবং তার দল কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে একটি পরীক্ষা চালিয়েছেন। তারা মূলত 'হাইড্রোজেন সায়ানাইড' নামের একটি রাসায়নিক যৌগের ওপর ধূমকেতুর আঘাতের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। কার্বন ও নাইট্রোজেনের শক্তিশালী বন্ধনে যুক্ত এই অণুটি অন্যান্য কার্বন-ভিত্তিক রাসায়নিকের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল। কিন্তু সিমুলেশনে দেখা গেছে, ধূমকেতু থেকে পৃথিবীতে এই অণুটির অক্ষত অবস্থায় পৌঁছানো অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। এক বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় ধরে হয়তো মাত্র একটি সংঘর্ষেই পর্যাপ্ত পরিমাণ হাইড্রোজেন সায়ানাইড পৃথিবীতে টিকে থাকতে পেরেছিল।
ধূমকেতুর আঘাতে কোনো রাসায়নিক উপাদানকে টিকে থাকতে হলে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পূরণ করতে হতো। ধূমকেতুটিকে ১০০ মিটারের চেয়ে বড় হতে হবে, এর গতি ধীর হতে হবে এবং তা একটি তীর্যক কোণে পৃথিবীতে আঘাত হানতে হবে। এর পাশাপাশি, বিক্রিয়া শুরু হওয়ার জন্য সেটিকে মহাসাগরের বদলে সরাসরি স্থলে আছড়ে পড়তে হতো, কারণ পানিতে পড়লে রাসায়নিকগুলো দ্রুত পাতলা হয়ে যেত। মজার ব্যাপার হলো, সিমুলেশন থেকে দেখা গেছে পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গল গ্রহে কার্বন-ভিত্তিক অণুগুলো পৌঁছানোর সম্ভাবনা বেশি ছিল। কারণ মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পাতলা এবং সেখানে ধূমকেতুর আঘাতের গতিও অনেক কম ছিল।
যদি পৃথিবীর কার্বন-ভিত্তিক রাসায়নিকগুলো ধূমকেতু থেকে না এসে থাকে, তবে এর বিকল্প উৎস কী হতে পারে? কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গ্রহ ভূতাত্ত্বিক গর্ডন ওসিনস্কির মতে, কার্বন-সমৃদ্ধ গ্রহাণু 'কার্বোনেশাস কনড্রাইটস' (carbonaceous chondrites) থেকে এই উপাদানগুলো আসতে পারে। এছাড়া পৃথিবীর নিজস্ব আগ্নেয়গিরি এবং সমুদ্রের তলদেশের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা উষ্ণ প্রস্রবণগুলোও প্রাণের প্রাথমিক রাসায়নিক উপাদান তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। এই নতুন গবেষণা বিজ্ঞানীদের প্রাণের উৎপত্তির আসল রহস্য সন্ধানে বিকল্প পথগুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে।
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| গবেষণার বিষয় | পৃথিবীতে প্রাণের রাসায়নিক উপাদানের উৎস হিসেবে ধূমকেতুর ভূমিকা |
| প্রকাশনার তারিখ | ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ |
| জার্নালের নাম | সায়েন্টিফিক রিপোর্টস (Scientific Reports) |
| মূল গবেষক | রিচার্ড আনস্লো (যুক্তরাজ্যের মেট অফিস) |
| পরীক্ষিত রাসায়নিক অণু | হাইড্রোজেন সায়ানাইড |
| বিকল্প সম্ভাব্য উৎস | কার্বন-সমৃদ্ধ গ্রহাণু, আগ্নেয়গিরি ও হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট |