
স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাককে অনেকেই এক করে দেখেন। তবে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন শারীরিক সমস্যা। হার্ট অ্যাটাক হয় হৃদ্যন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে, আর স্ট্রোক হয় মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক মিনিটের দেরিও রোগীর চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের। মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হলে তাকে ইস্কেমিক স্ট্রোক বলা হয়। অন্যদিকে, মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে সেটি হেমোরেজিক স্ট্রোক। দুই ধরনের স্ট্রোকই জরুরি চিকিৎসার দাবি রাখে। তবে চিকিৎসার পদ্ধতি এক নয়।
কারও স্ট্রোক হয়েছে বলে সন্দেহ হলে এক মুহূর্তও দেরি না করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। সম্ভব হলে অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন। রোগীকে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যেতে দেবেন না।
লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, সেই সময়টি লিখে রাখুন। যদি ঠিক কখন লক্ষণ দেখা দিয়েছে তা জানা না থাকে, তাহলে রোগীকে সর্বশেষ কখন স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গিয়েছিল, সেটি মনে রাখুন। চিকিৎসকের কাছে এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
স্ট্রোকের সন্দেহ হলে রোগীকে পানি, খাবার কিংবা মুখে খাওয়ার ওষুধ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ, স্ট্রোকের পর অনেকের গিলতে সমস্যা হয়। এতে খাবার বা পানি শ্বাসনালিতে ঢুকে শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিনও দেওয়া উচিত নয়। কারণ, সব স্ট্রোক রক্ত জমাট বাঁধার কারণে হয় না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। এমন অবস্থায় ভুল ওষুধ বিপদ বাড়াতে পারে।
স্ট্রোকের কিছু লক্ষণ কয়েক মিনিটের মধ্যে কমে যেতে পারে। হাতের দুর্বলতা দূর হতে পারে, কথা বলাও আবার স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বিপদ কেটে গেছে।
এ ধরনের ঘটনা ক্ষণস্থায়ী ইস্কেমিক অ্যাটাক বা টিআইএ (TIA) হতে পারে। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হলে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। টিআইএ ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকির সতর্কসংকেতও হতে পারে।
বাড়িতে বসে টিআইএ ও স্ট্রোকের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তাই লক্ষণ সেরে গেলেও দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের মূল্যায়ন করানো জরুরি।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করে স্ট্রোকের ধরন নির্ধারণ করা হয়।
ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে রক্ত জমাট গলানোর ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতিতে রক্তনালি থেকে জমাট অপসারণের চিকিৎসাও সম্ভব। অন্যদিকে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে চিকিৎসার ধরন ভিন্ন হয়।
কোন রোগীর জন্য কোন চিকিৎসা উপযুক্ত, তা নির্ভর করে স্ট্রোকের ধরন, লক্ষণ শুরুর সময়, পরীক্ষার ফল এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর। তাই দেরি হয়ে গেছে মনে হলেও হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করা যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
স্ট্রোকের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসনও গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কাজের প্রশিক্ষণ, কথা বলা ও গিলতে পারার থেরাপি এবং মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়।
পুনর্বাসনের লক্ষ্য হলো রোগীর হারানো সক্ষমতা যতটা সম্ভব ফিরিয়ে আনা এবং তাকে দৈনন্দিন জীবনে আরও স্বনির্ভর হতে সহায়তা করা। তবে সুস্থ হয়ে ওঠার গতি ও মাত্রা সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। এটি নির্ভর করে মস্তিষ্কের ক্ষতির পরিমাণ, আক্রান্ত স্থানের অবস্থান এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর।
এ সময় পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে মানসিকভাবে সাহস দেওয়া, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুনর্বাসনে সহায়তা করা প্রয়োজন। কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে বলে রোগীর মতামত বা ব্যক্তিগত মর্যাদাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে রোগীর যত্ন নেওয়া পরিবারের সদস্যদের বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, একটি হাত হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়া—স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এ ছাড়া হঠাৎ দৃষ্টির সমস্যা, ভারসাম্য হারানো বা অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথাও দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব স্ট্রোক দিবসে স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারের প্রস্তুতি থাকা জরুরি। জরুরি চিকিৎসাসেবার নম্বর জানা, লক্ষণগুলো চিনতে পারা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত দুর্বল হওয়া কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়াকে সাময়িক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা নয়—অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন। দ্রুত নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই একজন মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।