
ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনের ভোট গণনা শেষ হলেও দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা কাটেনি। নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় সরকার গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। তবে এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ছাড়ার তাৎক্ষণিক কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। বিরোধী দলগুলো সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন তিনি।
কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর আচরণে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বিজয়ের দাবি জানানোর পরিবর্তে তিনি নির্বাচনকে ‘চুরি’ করা হয়েছে কিংবা এর ফলাফল অবৈধ—এমন অভিযোগ তুলছেন। তাঁর এই অবস্থান নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে, নির্বাচনের ফলাফল সত্ত্বেও কেন এতটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী?
নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও উদ্বিগ্ন তিনি।
আরব দলগুলোর জয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নেতানিয়াহু
নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বিতর্কে নেতানিয়াহুর প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে আরব রাজনৈতিক দলগুলো। এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পাওয়ার পর তাদের এই সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন তিনি।
নেতানিয়াহুর অভিযোগ, আরব দলগুলোর এই আসনপ্রাপ্তির পেছনে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অনিয়ম থাকতে পারে। তবে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেট এবং নির্বাচন কমিশন তাঁর উত্থাপিত অনিয়মের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পায়নি বলে জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্যকে অবৈধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পেছনে নেতানিয়াহুর দুটি রাজনৈতিক হিসাব থাকতে পারে।
প্রথমত, ইহুদি ও আরব দলগুলোর সমন্বয়ে বিরোধী জোট গঠনের সম্ভাবনাকে শুরুতেই বিতর্কিত করে তোলা। এতে এমন কোনো জোট সরকার গঠনের উদ্যোগ নিলে সেটিকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারানোর মুখে ফেলতে পারবেন তিনি।
দ্বিতীয়ত, সামনে আবার নির্বাচন হলে নিজের ডানপন্থী সমর্থকদের আরও সক্রিয় করা এবং আরব ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। এর মাধ্যমে নির্বাচনী আসনসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে তাঁর জন্য।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকার পরিচালনায় সংকট
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উদ্বেগের পেছনে আরও বড় কারণ রয়েছে সংসদের আসনসংখ্যার হিসাব। ইসরাইলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা ৫৩। এর মধ্যে ৪০টি আসন স্পষ্ট জায়নবাদী দলগুলোর দখলে। বাকি ১৩টি আসন আল্ট্রা-অর্থোডক্স ধর্মীয় দলগুলোর।
অন্যদিকে, ইহুদি-ভিত্তিক বিরোধী দলগুলোর আসনসংখ্যা ৪৮। ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর জোটকে নিজেদের মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
কিন্তু এই মিত্রদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে তাঁর। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের প্রশ্নে আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর অবস্থান নেতানিয়াহুকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
সেনাবাহিনীতে নিয়োগ নিয়ে জোটে বিরোধ
ইসরাইলে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের নিয়ম থাকলেও ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এই ছাড় অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলো।
অন্যদিকে, দেশটির অধিকাংশ নাগরিকের মধ্যে সবার জন্য সমানভাবে সামরিক দায়িত্ব পালনের দাবি রয়েছে। ফলে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের নিয়োগে ছাড় দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
নেতানিয়াহুর জোটের আল্ট্রা-অর্থোডক্স শরিকরা এ বিষয়ে নিজেদের দাবিতে অনড়। কিন্তু সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তাদের চাহিদা অনুযায়ী আইন পাস করানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই বিরোধের সমাধান না হলে নেতানিয়াহুর জোটের ভেতরেই বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে।
ক্ষমতায় থাকলেও বাড়ছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
আইনগতভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে কার্যকর সরকার পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রাখা নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। প্রয়োজনীয় সংসদীয় সমর্থন না পাওয়া এবং জোটের শরিকদের সঙ্গে মতবিরোধ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরবর্তী নির্বাচনে আসনসংখ্যা বাড়াতে না পারলে নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকলেও কার্যকর সরকার পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সমর্থন ধরে রাখতে ব্যর্থ হতে পারেন।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা নেতানিয়াহুর জন্য তাই বর্তমান পরিস্থিতি বড় পরীক্ষা। নির্বাচনের ফলাফল, আরব দলগুলোর ভূমিকা এবং সামরিক নিয়োগ নিয়ে জোটের বিরোধ—সব মিলিয়ে তাঁর সামনে তৈরি হয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল।