
ভূতুড়ে পোশাক, ভয়ংকর মুখোশ, আলো জ্বলা কুমড়ো আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে মিষ্টি সংগ্রহ—এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে হ্যালোইন উৎসব। আজ ৩১ অক্টোবর, শনিবার। প্রতি বছর এই দিনটিতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবটি উদ্যাপন করেন বিভিন্ন দেশের মানুষ।
শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—সব বয়সের মানুষই এ উৎসবে অংশ নেন। কেউ সাজেন ভূত, ডাইনি, কঙ্কাল কিংবা ভ্যাম্পায়ার। আবার কেউ বেছে নেন জনপ্রিয় সিনেমা বা কমিকসের কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক। হ্যালোইন ঘিরে চলে কুমড়ো খোদাই, থিম পার্টি, ভৌতিক সিনেমা দেখা এবং শিশুদের ‘ট্রিক অর ট্রিট’ আয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে হ্যালোইন বেশ জনপ্রিয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও উৎসবটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হ্যালোইন এখন বিনোদন ও আনন্দ উদ্যাপনের অন্যতম উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর নির্দিষ্ট তারিখেই পালিত হয় হ্যালোইন। উৎসবটির নাম এসেছে ইংরেজি ‘অল হ্যালোজ ইভ’ (All Hallows’ Eve) থেকে। খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর পালিত হয় ‘অল সেইন্টস ডে’ বা সব সাধুর দিবস। এর আগের সন্ধ্যাকেই বলা হতো অল হ্যালোজ ইভ। সময়ের ব্যবধানে এই নাম সংক্ষিপ্ত হয়ে হ্যালোইনে রূপ নেয়।
এর পরদিন ২ নভেম্বর পালিত হয় ‘অল সোলস ডে’। এদিন খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে প্রয়াত ব্যক্তিদের স্মরণ করা হয়।
হ্যালোইনের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে মৃত ব্যক্তিদের স্মরণ, অতিপ্রাকৃত শক্তির ধারণা এবং শরৎ শেষে শীতের আগমনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে আধুনিক সময়ে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যের পাশাপাশি উৎসবটি মূলত সাজসজ্জা, পোশাক, পার্টি ও বিনোদনকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে।
হ্যালোইনের ইতিহাসের শিকড় কয়েক হাজার বছর আগের প্রাচীন কেল্টিক সংস্কৃতিতে রয়েছে বলে মনে করা হয়। ধারণা করা হয়, ‘সামহেইন’ (Samhain) নামের একটি প্রাচীন কেল্টিক উৎসব থেকেই হ্যালোইনের প্রচলন শুরু।
বর্তমান আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে সামহেইন উৎসব পালিত হতো। এর মাধ্যমে ফসল কাটার মৌসুমের সমাপ্তি এবং শীতের আগমনকে চিহ্নিত করা হতো।
প্রাচীন কেল্টিকদের বিশ্বাস ছিল, এ সময় জীবিত মানুষ ও মৃতদের জগতের মধ্যকার দূরত্ব কমে আসে। ফলে মৃত আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। এ বিশ্বাস থেকে আগুন জ্বালানো এবং আত্মাদের থেকে নিজেদের রক্ষা করতে অদ্ভুত পোশাক পরার মতো রীতির প্রচলন হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রভাব পড়ে উৎসবটিতে। ১ নভেম্বর অল সেইন্টস ডে এবং ২ নভেম্বর অল সোলস ডে পালনের রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগের সন্ধ্যা পরিচিতি পায় অল হ্যালোজ ইভ নামে।
উনিশ শতকে আইরিশ ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিজেদের সঙ্গে হ্যালোইনের বিভিন্ন রীতি নিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে দেশটিতে উৎসবটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
হ্যালোইন ঘিরে বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের আয়োজন দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত কয়েকটি হলো—
হ্যালোইনের অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজন ‘ট্রিক অর ট্রিট’। এদিন শিশুরা ভূত, ডাইনি, দানব কিংবা নানা কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যায়।
বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে তারা বলে, ‘ট্রিক অর ট্রিট’। এর অর্থ—মিষ্টি দাও, নইলে দুষ্টুমি করব। এরপর বাড়ির লোকজন শিশুদের হাতে তুলে দেন চকলেট, ক্যান্ডি ও নানা ধরনের মিষ্টি।
এই আয়োজনের সঙ্গে পুরোনো লোকজ বিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে আত্মাদের উদ্দেশে খাবার দেওয়ার রীতির সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করা হয়।
হ্যালোইনের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হলো ‘জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন’। এ রীতিতে কুমড়োর ভেতরের অংশ ফাঁকা করে বাইরের খোসায় চোখ, নাক ও মুখের আকৃতি তৈরি করা হয়। এরপর কুমড়োর ভেতরে আলো জ্বালিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয়।
এর পেছনে রয়েছে আয়ারল্যান্ডের পুরোনো লোককাহিনি। স্টিঞ্জি জ্যাক নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরে প্রচলিত গল্পে বলা হয়, শয়তানকে ধোঁকা দেওয়ার কারণে তাকে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানোর অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল। পথ দেখার জন্য তার হাতে ছিল খোদাই করা শালগমের ভেতরে রাখা জ্বলন্ত কয়লা।
পরবর্তী সময়ে আইরিশ অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে শালগমের পরিবর্তে কুমড়ো ব্যবহার শুরু করেন। কারণ কুমড়ো খোদাই করা তুলনামূলক সহজ ছিল। সেই থেকে হ্যালোইনে কুমড়োর ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
হ্যালোইন মানেই বিচিত্র সব পোশাক। এদিন অনেকেই ভূত, ডাইনি, কঙ্কাল, ভ্যাম্পায়ার ও দানবের সাজে নিজেদের উপস্থাপন করেন।
তবে সময়ের সঙ্গে এই সাজের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। এখন শুধু ভয়ংকর চরিত্র নয়, জনপ্রিয় সিনেমার নায়ক-নায়িকা, সুপারহিরো ও কার্টুন চরিত্রের পোশাকও বেশ জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় আয়োজন করা হয় সেরা পোশাক নির্বাচনের প্রতিযোগিতা।
হ্যালোইন উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে আয়োজন করা হয় বিশেষ থিম পার্টি। বাড়ি, রেস্তোরাঁ ও পার্টি সেন্টার সাজানো হয় মাকড়সার জাল, বাদুড়, কঙ্কাল ও ভূতের প্রতিকৃতি দিয়ে।
এসব আয়োজনে থাকে বিশেষ খাবার, সংগীত, নাচ, খেলাধুলা এবং পোশাক প্রতিযোগিতা। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বড়রাও এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
হ্যালোইনের আনন্দ বাড়াতে অনেকেই আয়োজন করেন ভৌতিক সিনেমা দেখার অনুষ্ঠান। বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে হরর সিনেমা দেখার আয়োজনও বেশ জনপ্রিয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা হয় ‘হন্টেড হাউস’ বা ভুতুড়ে বাড়ি। এসব জায়গায় অন্ধকার পথ, কৃত্রিম ভূত, অদ্ভুত শব্দ ও ভয় ধরানো নানা দৃশ্যের ব্যবস্থা থাকে। দর্শনার্থীরা সেখানে গিয়ে ভয়ের অভিজ্ঞতা উপভোগ করেন।
হ্যালোইন উৎসবের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে কমলা ও কালো রং। তবে সাজসজ্জায় বেগুনি ও সবুজ রঙেরও ব্যবহার দেখা যায়।
কমলা: শরৎকাল, পাকা কুমড়ো এবং ফসল কাটার মৌসুমের প্রতীক।
কালো: অন্ধকার, রাত ও রহস্যময় পরিবেশের প্রতীক।
বেগুনি: হ্যালোইনের আধুনিক সাজসজ্জায় বহুল ব্যবহৃত একটি রং।
সবুজ: ভূতুড়ে চরিত্র, দানব ও রহস্যময় পরিবেশ ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া কুমড়ো, বাদুড়, ডাইনি, কালো বিড়াল, ভূত ও কঙ্কাল হ্যালোইনের পরিচিত প্রতীক।
একসময় মৃত আত্মা ও অতিপ্রাকৃত শক্তিকে ঘিরে নানা বিশ্বাস থেকে যে উৎসবের প্রচলন হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা রূপ নিয়েছে আনন্দ ও বিনোদনের আয়োজনে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হ্যালোইন পালিত হচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও আয়োজনের বৈচিত্র্য নিয়ে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি