
নিজের নামে থাকা জমি, বাড়ি কিংবা অন্য কোনো সম্পত্তি সন্তান, স্বামী-স্ত্রী বা নিকটাত্মীয়ের নামে লিখে দিতে চান অনেকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর একটি হলো দান বা হেবা। তবে শুধু দলিল তৈরি ও নিবন্ধন করলেই সম্পত্তি হস্তান্তরের সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় না। বিশেষ করে হেবার ক্ষেত্রে ঘোষণা, গ্রহণ এবং দখল হস্তান্তরের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
আইনগত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ২০২৬ সালে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন বিধান যুক্ত হওয়ায় দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করেও নির্দিষ্ট শর্তে দান করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে সম্পত্তি দানের সাধারণ বিধান রয়েছে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ও ১২৩ ধারায়। অন্যদিকে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে সম্পত্তি দানের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হলো হেবা।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় এবং বিনিময়মূল্য ছাড়াই নিজের বিদ্যমান স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অন্য কাউকে হস্তান্তর করলে এবং গ্রহীতা বা তাঁর পক্ষে কেউ তা গ্রহণ করলে সেটিকে দান বলা হয়।
যিনি সম্পত্তি দান করেন, তিনি দাতা। আর যিনি গ্রহণ করেন, তিনি দানগ্রহীতা।
আইন অনুযায়ী, বৈধ দানের জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, দান হতে হবে স্বেচ্ছায় এবং কোনো ধরনের বিনিময়মূল্য ছাড়া। দ্বিতীয়ত, দাতাকে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির বৈধ মালিক হতে হবে এবং দান করার আইনগত সক্ষমতা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, দানগ্রহীতা বা তাঁর পক্ষে কোনো বৈধ প্রতিনিধি দানটি গ্রহণ করবেন।
এ ক্ষেত্রে দাতার জীবদ্দশায় এবং তিনি দান করার সক্ষমতা থাকা অবস্থায় সম্পত্তি গ্রহণের বিষয়টি সম্পন্ন হতে হবে।
জমি বা বাড়ির মতো স্থাবর সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল করতে হয়। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৩ ধারা অনুযায়ী, দাতার স্বাক্ষরযুক্ত দলিল অন্তত দুইজন সাক্ষীর মাধ্যমে সত্যায়িত হতে হবে।
অন্যদিকে অস্থাবর সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল অথবা আইন অনুযায়ী দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে দান সম্পন্ন করা যেতে পারে।
মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে সম্পত্তি দানের পদ্ধতিকে হেবা বলা হয়। সাধারণ দানের মতো হেবার ক্ষেত্রেও কোনো বিনিময়মূল্য ছাড়াই সম্পত্তি হস্তান্তর করা হয়। তবে হেবা বৈধ হওয়ার জন্য তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১. ঘোষণা: দাতাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে তিনি সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি হেবা করতে চান।
২. গ্রহণ: যাঁকে সম্পত্তি হেবা করা হচ্ছে, তাঁকে অথবা তাঁর পক্ষে বৈধ প্রতিনিধিকে তা গ্রহণ করতে হবে।
৩. দখল হস্তান্তর: সম্পত্তির প্রকৃতি ও আইনস্বীকৃত পদ্ধতি অনুযায়ী দখল গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
বাংলাদেশে স্থাবর সম্পত্তির হেবা ঘোষণার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৩ ধারা এবং নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ১৭ ধারায় এ বিষয়ে বিধান রয়েছে।
তবে শুধু হেবা দলিল নিবন্ধন করলেই সব ক্ষেত্রে হেবা সম্পূর্ণ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। ঘোষণা ও গ্রহণের পাশাপাশি দখল হস্তান্তরের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর দেওয়া এক রায়ে হেবা বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে এই তিনটি শর্তের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিবন্ধিত হেবা দলিল থাকলেই দখল হস্তান্তরের বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।
নিজের বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তি জীবদ্দশায় দান বা হেবা করার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে এক-তৃতীয়াংশের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি তাঁর বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তির পুরোটা বা একটি অংশ দান করতে পারেন।
তবে তিনি যতটুকু সম্পত্তির বৈধ মালিক, কেবল ততটুকুই হস্তান্তর করতে পারবেন।
এখানে দান বা হেবার সঙ্গে ওসিয়তের নিয়ম গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে ওসিয়তের ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। কিন্তু জীবদ্দশায় সম্পন্ন বৈধ দান বা হেবার নিয়ম আলাদা।
তবে উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে দলিল তৈরি করা হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তাই সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে মালিকানা ও দলিলের বৈধতা যাচাই করা জরুরি।
নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৭৮ক ধারায় নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়ের মধ্যে হেবা ঘোষণার নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই নির্দিষ্ট ফি প্রযোজ্য হবে যেসব সম্পর্কের ক্ষেত্রে—
এই সম্পর্কগুলোর বাইরে অন্য কাউকে হেবা করলে ১০০ টাকার নির্দিষ্ট নিবন্ধন ফি প্রযোজ্য হবে না। সে ক্ষেত্রে প্রচলিত সরকারি ফি ও অন্যান্য খরচ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জেনে নিতে হবে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, সাধারণ দানপত্র এবং মুসলিম আইনের হেবা ঘোষণার নিবন্ধন ফি এক নয়। দলিলের ধরন ও দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক অনুযায়ী ফি নির্ধারিত হয়।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সংশোধনের মাধ্যমে আইনে ১২২ক ও ১২২খ নামে দুটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে।
নতুন ১২২ক ধারায় নির্দিষ্ট কিছু সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি সম্পত্তি অন্যের নামে দান করলেও দলিলে নির্দিষ্ট শর্ত উল্লেখ করে নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগের অধিকার রাখতে পারবেন।
তবে এই সুবিধা সব ধরনের দানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সম্পর্কগুলো হলো—
এ ধরনের দানের ক্ষেত্রে স্থাবর সম্পত্তির জন্য নিবন্ধিত দলিল করতে হবে। পাশাপাশি দলিলে দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, দাতার জীবদ্দশায় দানগ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। তবে দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার বহাল থাকবে।
২০২৬ সালের সংশোধিত আইনের ১২২খ ধারায় নতুন এই পদ্ধতিতে করা দান বাতিলের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, ১২২ক ধারার অধীনে নিবন্ধিত দান সাধারণভাবে বাতিল করা যাবে না। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে।
দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সম্মতিতে প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান পরিবর্তন বা বাতিল করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক কিংবা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন থাকতে হবে।
আবার কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম অথবা অন্য কোনো কারণে সম্মতি দিতে না পারলে অপর পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের পর জেলা জজ এ বিষয়ে আদেশ দিতে পারেন।
অর্থাৎ, নতুন আইনে দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে তা বাতিলের জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
সম্পত্তি দান বা হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর দাতা ইচ্ছা করলেই একতরফাভাবে তা বাতিল করতে পারবেন—এমন সাধারণ নিয়ম নেই।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৬ ধারায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা ঘটলে দান স্থগিত বা বাতিল হবে—এমন শর্ত দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে থাকতে পারে। তবে সেই ঘটনা দাতার নিজের ইচ্ছাধীন হওয়া যাবে না।
অর্থাৎ, শুধু দাতার ইচ্ছায় যেকোনো সময় দান বাতিল করা যাবে—এমন শর্ত আইনসম্মত নয়।
এ ছাড়া প্রতারণা, জবরদস্তি কিংবা অযাচিত প্রভাবের মতো আইনি কারণ প্রমাণিত হলে দান বাতিলের প্রশ্ন আসতে পারে। তবে এ ধরনের ক্ষেত্রে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে হেবা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রেও আলাদা বিধান ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হেবা, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর, দখল হস্তান্তর এবং গ্রহীতার মৃত্যুর মতো বিষয় প্রত্যাহারের সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই সব ধরনের হেবা একই নিয়মে বাতিল করা যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়।
জমি বা অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, জমি বা সম্পত্তি দান কিংবা হেবা করার ক্ষেত্রে শুধু দলিল তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। মালিকানা, গ্রহণ, দখল হস্তান্তর ও নিবন্ধনের প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নতুন বিধান অনুযায়ী দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে চাইলে দলিল তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পরামর্শ নেওয়া উচিত।