
দীর্ঘ ১০ মাসের কঠিন চিকিৎসা ও জীবন-মৃত্যুর লড়াই পেরিয়ে আবারও শুটিংয়ে ফিরেছেন ছোট পর্দার অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টি। মস্তিষ্কে টিউমার, একাধিক অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি এবং লাইফ সাপোর্টে থাকার মতো সংকটময় পরিস্থিতি পেরিয়ে নতুন করে কাজে ফেরাকে নিজের ‘দ্বিতীয় জন্ম’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অসুস্থতা, চিকিৎসার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং অভিনয়ে ফেরার অনুভূতির কথা তুলে ধরেন এই অভিনেত্রী। দীর্ঘ বিরতির পর ইকসান রনির পরিচালনায় ‘অংশীদার’ নাটকের মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
তানিয়া বৃষ্টির অসুস্থতার শুরু গত বছরের ডিসেম্বরে। একটি নাটকের শুটিং চলাকালে হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয় তার। প্রথম চার দিন ব্যথা উপেক্ষা করেই কাজ চালিয়ে যান। তবে পঞ্চম দিনে বমি শুরু হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মস্তিষ্কে টিউমার শনাক্ত করেন চিকিৎসকেরা।
প্রাথমিকভাবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠার আশা থাকলেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে পড়ে। চেন্নাইয়ের এমজিএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন অনকোলজিস্ট তার সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন বলে সাক্ষাৎকারে জানান অভিনেত্রী। এমন কথা শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।
ঢাকায় প্রথম অস্ত্রোপচারের আগে পরিবার ও সহকর্মীদের কাছে অনেকটা বিদায়ের মতো কথা বলেছিলেন তানিয়া। পরে দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখতে হয়।
আইসিইউতে জ্ঞান ফেরার পর মা ও বোনের উপস্থিতি তাকে বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছিল বলে জানান অভিনেত্রী। বাবা না থাকায় অসুস্থতার পুরো সময় মায়ের নিরলস সেবা ও পরিবারের প্রার্থনাই ছিল তার বড় শক্তি।
এ কঠিন সময়ে নাট্যাঙ্গনের সহকর্মীরাও পাশে ছিলেন। অভিনেতা মোশাররফ করিম, নিলয় এবং প্রযোজক আলী বশীরসহ অনেকে নিয়মিত তার খোঁজখবর নিয়েছেন বলে জানান তানিয়া।
বর্তমানে আগের তুলনায় শারীরিক অবস্থা অনেকটাই স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী এখনো তার কেমোথেরাপির দুই মাসের কোর্স বাকি রয়েছে। দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি থাকায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। এ কারণে অনেক অনুরোধের পর একটি নাটকে অভিনয়ের অনুমতি পান।
‘অংশীদার’ নাটকে ‘সুমি’ চরিত্রে অভিনয় করছেন তানিয়া। পারিবারিক সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে নাটকের গল্প এগিয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর চাচার সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে সুমি।
শুটিংয়ে ফেরার প্রথম দিন থেকেই পরিচালক, ক্যামেরাম্যান ও প্রযোজনা দলের সদস্যরা তার স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিশেষ সতর্ক ছিলেন। দীর্ঘ ১০ মাস পর পরিচিত শুটিং ফ্লোরে ফিরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অভিনেত্রী। তার ভাষায়, সহকর্মীরা তার কাছে পরিবারের মতো, আর শুটিং ফ্লোর মানসিক শান্তির অন্যতম জায়গা।
অসুস্থতার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যু নিয়েও গুজব ছড়িয়েছিল। তবে সেসব নেতিবাচক অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে এখন জীবনকে ইতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করছেন তিনি।
ক্যানসারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশে তানিয়া বৃষ্টির পরামর্শ, রোগের নাম শুনেই যেন কেউ মনোবল হারিয়ে না ফেলেন। মানসিক শক্তি ধরে রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা এবং পরিবারের সঙ্গে ইতিবাচক সময় কাটানো এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ অসুস্থতা ও অনিশ্চয়তার পর আবারও অভিনয়ে ফেরা তানিয়া বৃষ্টির জন্য শুধু কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন নয়, বরং জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।