
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে চলচ্চিত্র তারকাদের প্রভাব দীর্ঘদিনের। অভিনয়জগৎ থেকে রাজনীতিতে এসে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের নজিরও রয়েছে রাজ্যটিতে। সম্প্রতি অভিনেতা সি জোসেফ বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থানের পর এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেতা ধানুশ। প্রশ্ন উঠেছে, তিনিও কি রাজনীতিতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন?
ধানুশকে ঘিরে সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড এবং তার ভক্তদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এই জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও অভিনেতার ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, আপাতত সিনেমার কাজ নিয়েই ব্যস্ত তিনি। ভক্তদের গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
গত ২৫ অক্টোবর চেন্নাইয়ের উপকণ্ঠে একটি বেসরকারি কলেজে নারী ভক্তদের নিয়ে সমাবেশের আয়োজন করেন ধানুশ। সেখানে কয়েক শ ভক্তকে পদ্মফুল খোদাই করা রুপার প্রদীপ উপহার দেন তিনি। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক পদ্মফুল হওয়ায় এ ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়।
এর আগে দিল্লি সফরে বিজেপি নেতাদের সঙ্গে ধানুশের সাক্ষাতের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। এসব ঘটনা মিলিয়ে অভিনেতার সঙ্গে বিজেপির সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে।
এ বিষয়ে কংগ্রেস নেতা মানিকম ঠাকুর অভিযোগ করেছেন, একজন চলচ্চিত্র অভিনেতাকে রাজনীতিতে যুক্ত করার মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে বিজেপি। তার দাবি, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য বিজেপির একটি পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনার বিভিন্ন ধাপে এআইএডিএমকের সাধারণ সম্পাদক এদাপ্পাদি কে পালানিস্বামী, সাবেক বিজেপি নেতা কে আন্নামালাই এবং সবশেষে কোনো অভিনেতাকে সামনে আনার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, এআইএডিএমকের কয়েকজন নেতা ধানুশকে তাদের দলে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধানুশের রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে আলোচনার আরেকটি কারণ তার ভক্ত সংগঠনের সাম্প্রতিক পরিবর্তন। গত ১৪ অক্টোবর নিজের ভক্ত সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে ‘ধানুশ ওয়েলফেয়ার মুভমেন্ট’ রাখেন অভিনেতা। এরপর সংগঠনের নতুন পতাকা ও প্রতীক চালুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সংগঠনের নেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক সুব্রামানিয়াম শিবা জানিয়েছেন, পতাকাটি নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। পতাকার মাঝখানে রয়েছে লাল তারকা ও ধানুশের ছবি। দুই পাশে তামিল ভাষায় লেখা ‘এন্নামপোল থান ভাঝক্কাই’। এর অর্থ, মানুষের জীবন তার চিন্তারই প্রতিফলন।
শিক্ষা ও আইনি সহায়তায় বড় পরিকল্পনা
ধানুশের ভক্ত সংগঠনকে ঘিরে আলোচনার অন্যতম বিষয় শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে পাঠদানকেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামিলনাড়ুর ২৩৪টি বিধানসভা আসনেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পাঠদানকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে এসব কেন্দ্র চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে তিনজন শিক্ষক ও একজন সহকারী নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁদের বেতন বহন করবে সংগঠনটি।
এ ছাড়া সংগঠনের সদস্য ও সাধারণ মানুষের আইনি সহায়তার জন্য রাজ্যজুড়ে তিন হাজার আইন উপদেষ্টা নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে।
গত ২৭ জুলাই তিরুভাল্লুর জেলার একটি অনুষ্ঠানে ভক্তদের উদ্দেশে ধানুশ বলেছিলেন, শুধু তার সিনেমার মুক্তি কিংবা অডিও প্রকাশের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেই হবে না। ভক্তদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আরও বড় কিছু করার চেষ্টা করতে হবে।
এক ভক্তের দাবি, ২০২৫ সাল থেকেই ধানুশ নিয়মিত সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। তৃণমূল পর্যায় থেকে সমর্থকদের সংগঠিত করাই তার লক্ষ্য। ওই ভক্তের আরও দাবি, ধানুশের সমর্থকদের একটি বড় অংশ ২০২৬ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়কে ভোট দিয়েছিলেন।
রাজনীতি নয়, আপাতত সিনেমাতেই মনোযোগ?
এত আলোচনা ও জল্পনার মধ্যেও ধানুশের ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্তের কথা তাদের জানা নেই। অভিনেতার আগামী ছবি ‘ওএম’-এর পরিচালক রাজকুমার পেরিয়াসামিও এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাননি।
তার ভাষ্য, ধানুশ সিনেমার প্রতি অত্যন্ত নিবেদিত। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনার কথা তিনি জানেন না। বর্তমানে ধানুশের ৫৫তম ছবির কাজ চলছে। এরই মধ্যে ৫৬তম ছবির মহরতও সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি অন্য ভাষার চলচ্চিত্রেও কাজ করছেন তিনি। ‘ওএম’ ছবিটি আগামী ২০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা।
২০০২ সালে ‘থুল্লুভাধো ইলামাই’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হয় ধানুশের। পরে ‘আদুকালাম’ ও ‘আসুরান’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে প্রশংসা পান তিনি। ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কোডি’ ছবিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিবিদ ও তার যমজ ভাইয়ের দ্বৈত চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন এই অভিনেতা।
সব মিলিয়ে ধানুশের ভক্ত সংগঠনের সম্প্রসারণ, সামাজিক উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। তবে এসব উদ্যোগের পেছনে সরাসরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, কিংবা ধানুশ সত্যিই রাজনীতিতে যোগ দেবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।