নিউজ প্রোভাইডার
মানুষের সভ্যতার বিকাশ আর শিল্পচেতনার আদিমতম এক মেলবন্ধনের নাম ‘টেরাকোটা’ বা পোড়ামাটি শিল্প। লাতিন শব্দ ‘টেরা’ (যার অর্থ মাটি) এবং ‘কোটা’ (যার অর্থ পোড়ানো)—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে শব্দটির উৎপত্তি। বিশেষ পদ্ধতিতে প্রস্তুতকৃত নরম কাদার ওপর নান্দনিক নকশা ফুটিয়ে তুলে, তা আগুনে পুড়িয়ে স্থায়িত্ব দেওয়ার এই প্রাচীন ও মনকাড়া শিল্পমাধ্যমটি আজও মানুষের মন জয় করে চলেছে।
টেরাকোটা বা পোড়ামাটির এই বর্ণিল জগতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিচে তুলে ধরা হলো।
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাংলার মেলবন্ধন
প্রাচীন সভ্যতার সাক্ষী: টেরাকোটা মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীনতম একটি শিল্পমাধ্যম। আজ থেকে প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে প্রাগৈতিহাসিক যুগে এই শিল্পের সূত্রপাত ঘটেছিল। চীনের বিশ্ববিখ্যাত ‘টেরাকোটা আর্মি’ কিংবা আমাদের প্রাচীন বাংলার সুপ্রাচীন বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরগুলো এই ঐতিহাসিক শিল্পের শ্রেষ্ঠত্বের জীবন্ত প্রমাণ।
বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য: বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও পলিমাটির দেশ হওয়ায় এখানে উন্নত মানের আঠালো মাটির সহজলভ্যতা ছিল প্রচুর। আর এই মাটির প্রাচুর্যতার কারণেই প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার মন্দির, মসজিদ বা অভিজাতদের ঘর সাজাতে অনন্য সব টেরাকোটা ফলক তথা কারুকার্যময় ইটের ব্যাপক ব্যবহার হয়ে আসছে।
নির্মাণশৈলী ও বহুমুখী ব্যবহার
প্রস্তুত প্রণালী: সাধারণত আঠালো মাটির সাথে খড়কুটো বা ধানের তুষ মিশিয়ে প্রথমে একটি বিশেষ কাদা তৈরি করা হয়। এরপর দক্ষ কারিগরেরা হাতের স্পর্শে কিংবা নির্দিষ্ট ছাঁচের সাহায্যে বিভিন্ন দেব-দেবী বা সাধারণ মানুষের মূর্তি, নান্দনিক টাইলস এবং বৈচিত্র্যময় পাত্রের অবয়ব ফুটিয়ে তোলেন। সর্বশেষে তা আগুনে পুড়িয়ে টেকসই রূপ দেওয়া হয়।
আধুনিক ব্যবহার: বর্তমানে ঘর সাজানোর সৌখিন সামগ্রী, শোপিস, টব, ছাদ বা মেঝের জন্য আকর্ষণীয় টাইলস এবং ঘরের দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়াতে দৃষ্টিনন্দন দেয়ালচিত্র বা মুরাল তৈরিতে টেরাকোটার কদর দিন দিন বাড়ছে।
টেরাকোটার নিজস্ব রঙ
ফ্যাশন এবং শিল্পকলার জগতে ‘টেরাকোটা’ বলতে সাধারণত পোড়ামাটির সেই চিরচেনা উজ্জ্বল বাদামি-কমলা (Reddish-brown) আভাটাকেই বোঝানো হয়। মাটির এই প্রাকৃতিক রঙটি যেকোনো পরিবেশেই এক ধরনের স্নিগ্ধতা ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া এনে দেয়।
বিশ্বমঞ্চে যেভাবে সমাদৃত ‘টেরাকোটা’ শিল্প
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টেরাকোটা কেবল একটি প্রাচীন মাধ্যমই নয়, বরং মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য ও স্থাপত্যশৈলী হিসেবে এটি উচ্চ সমাদর লাভ করেছে। বিশ্বজুড়ে এর গ্রহণযোগ্যতার প্রধান কয়েকটি ক্ষেত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
চীনের অবিস্মরণীয় ‘টেরাকোটা আর্মি’: চীনের শিয়ান প্রদেশে মাটির নিচ থেকে আবিষ্কৃত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের হাজার হাজার পোড়ামাটির সৈন্য ও ঘোড়ার মূর্তি বা ‘টেরাকোটা আর্মি’ আজ বিশ্ববাসীর কাছে এক পরম বিস্ময়। ইউনেস্কো ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানটি পৃথিবীর অন্যতম সেরা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সমাদৃত।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতির আভিজাত্য:প্রাচীন গ্রিস এবং রোমান সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে দেব-দেবী, পৌরাণিক চরিত্র ও বীর যোদ্ধাদের প্রতিকৃতি নির্মাণে টেরাকোটার অবদানের জুড়ি ছিল না। যুগের পর যুগ টিকে থাকা সেসব অমূল্য শিল্পকর্ম আজ ইউরোপের নামী-দামী জাদুঘরগুলোতে অত্যন্ত যত্ন ও মর্যাদার সাথে প্রদর্শন করা হয়।
আধুনিক আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান কদর: বর্তমান যুগে পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং নান্দনিক হওয়ার কারণে ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উন্নত দেশগুলোতে ইন্টেরিয়র ডিজাইন বা ঘরের অভ্যন্তরীণ সজ্জা এবং ছাদের শৈল্পিক কারুকার্যে টেরাকোটার চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে, বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি পোড়ামাটির বৈচিত্র্যময় ফলক ও শোপিস এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে এবং বিশ্বমঞ্চে কুড়াচ্ছে দুহাত ভরে প্রশংসা।
শহুরে যান্ত্রিকতার এই যুগে ঘরের কোণে একটুখানি মাটির ছোঁয়া পেতে এবং শিকড়ের সন্ধান করতে টেরাকোটা সামগ্রীর জুড়ি মেলা ভার।