
জমির খতিয়ানে নিজের কিংবা পূর্বপুরুষের নাম রয়েছে, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না মূল দলিল। এমন পরিস্থিতিতে জমির মালিকানা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন অনেকেই। কেউ মনে করেন, খতিয়ানে নাম থাকলেই জমির মালিকানা নিশ্চিত। আবার মূল দলিল না থাকায় অনেকে আশঙ্কা করেন, জমির অধিকার হারাতে পারেন।
তবে আইন অনুযায়ী, খতিয়ানে নাম থাকা জমির মালিকানার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলেও এটি এককভাবে চূড়ান্ত মালিকানার দলিল নয়। মূল দলিল হারিয়ে গেলেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তার নকল সংগ্রহ এবং অন্যান্য নথির মাধ্যমে মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।
ভূমি আইনসংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথমে জানতে হবে জমিটি কীভাবে অর্জিত হয়েছিল, কোন জরিপে মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের তথ্য সংরক্ষিত আছে কি না।
খতিয়ানে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলে তা জমির মালিকানার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৪এ ধারা অনুযায়ী, ওই আইনের অধীনে প্রস্তুত বা সংশোধিত স্বত্বলিপির প্রতিটি এন্ট্রি প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়। বিপরীত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, খতিয়ানে নাম থাকলেই মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যথাযথ প্রমাণের মাধ্যমে খতিয়ানের তথ্য ভুল প্রমাণ করা সম্ভব।
জমিটি কীভাবে অর্জিত হয়েছে, পূর্ববর্তী মালিকের সঙ্গে বর্তমান দাবিদারের সম্পর্ক কী এবং জমির দখল কার কাছে রয়েছে, এসব বিষয়ও মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত ভূমি জরিপের ভিত্তিতে সিএস, এসএ, আরএস, বিএস ও সিটি জরিপের খতিয়ান তৈরি হয়েছে।
নিজের বা পূর্বপুরুষের নাম কোন জরিপের খতিয়ানে রয়েছে, তা প্রথমে শনাক্ত করতে হবে। কারণ পুরোনো জরিপে নাম থাকলেও পরবর্তী জরিপে জমির দাগ নম্বর, পরিমাণ কিংবা মালিকানার তথ্যে পরিবর্তন আসতে পারে।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট জমির সব প্রাসঙ্গিক খতিয়ান সংগ্রহ করে মালিকের নাম, মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও সীমানা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সর্বশেষ জরিপের তথ্যের সঙ্গে আগের নথিগুলোর সামঞ্জস্য যাচাই করা জরুরি।
জমির মূল দলিল হারিয়ে গেলে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
জমিটি বিক্রয়, দান, হেবা কিংবা বণ্টনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসের রেজিস্টার ও সূচিবহিতে দলিলের তথ্য থাকার কথা।
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫৭ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত ফি দিয়ে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার ও সূচিবহি পরিদর্শন করা যায়। সেখানে দলিলের তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী সার্টিফায়েড কপি বা দলিলের নকল সংগ্রহ করা সম্ভব।
দলিলের নম্বর ও রেজিস্ট্রির সাল জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়। তবে এসব তথ্য জানা না থাকলেও ক্রেতা-বিক্রেতার নাম, সম্ভাব্য রেজিস্ট্রির সময়, মৌজা ও জমির অন্যান্য পরিচিত তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
দলিলের নকল সংগ্রহের জন্য যেসব তথ্য কাজে আসতে পারে—
সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনুসন্ধান করেও দলিলের তথ্য না পাওয়া গেলে জমির মালিকানা নেই, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। কারণ জমির মালিকানা অর্জনের পথ শুধু বিক্রয় দলিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
উত্তরাধিকার, সরকারি বন্দোবস্ত, নিলাম কিংবা আদালতের ডিক্রির মাধ্যমেও জমির মালিকানা অর্জিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মালিকানার উৎস অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে হবে।
উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেয়ে থাকলে পূর্ববর্তী মালিকের দলিল, খতিয়ান, মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশ সনদসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি বন্দোবস্তের জমি হলে বরাদ্দপত্র বা সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ সংগ্রহ করতে হবে। আর আদালতের মাধ্যমে মালিকানা অর্জিত হয়ে থাকলে রায়, ডিক্রি ও প্রয়োজনীয় আদেশের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করতে হবে।
জমির মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু কাগজপত্র দেখলেই হবে না, বাস্তবে জমির অবস্থান ও দখলের বিষয়টিও পরীক্ষা করতে হবে।
খতিয়ান, দলিল এবং অন্যান্য নথিতে উল্লেখ করা মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও সীমানার সঙ্গে বাস্তব জমির অবস্থান মিলিয়ে দেখা জরুরি।
প্রয়োজনে মৌজা নকশা সংগ্রহ করে অভিজ্ঞ আমিনের মাধ্যমে জমির অবস্থান ও পরিমাণ যাচাই করা যেতে পারে। জমি অন্য কারও দখলে থাকলে কিংবা সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে।
এ ছাড়া ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা, নামজারি খতিয়ান এবং দখলসংক্রান্ত অন্যান্য কাগজপত্র মালিকানার দাবির পক্ষে সহায়ক প্রমাণ হতে পারে। তবে নামজারি বা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের কাগজও এককভাবে চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ নয়।
সব নথি যাচাইয়ের পরও মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে রেকর্ড সংশোধনের আবেদন কিংবা উপযুক্ত আদালতে আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
বিশেষ করে জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা, পূর্ববর্তী দলিল, উত্তরাধিকার এবং দখলের তথ্য একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, মূল দলিল হারিয়ে গেলেই জমির মালিকানা হারিয়ে যায় না। খতিয়ান, দলিলের সার্টিফায়েড কপি এবং মালিকানা অর্জনের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি সংগ্রহ করে আইনগতভাবে নিজের অধিকার যাচাই ও প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে।