
ডেঙ্গু জ্বর কমে গেলেই রোগী বিপদমুক্ত—এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার পরই ডেঙ্গুর জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ সময় শ্বাসকষ্ট, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি কিংবা রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিলে তা গুরুতর বিপদের সংকেত হতে পারে। তাই জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার দিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরি।
ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত এ রোগে জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি বমি ভাব ও ত্বকে র্যাশ দেখা দেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
গুরুতর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে বুকের ভেতরে জমতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে প্লুরাল ইফিউশন বলা হয়। ফুসফুসের চারপাশে তরল জমলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।
এ ছাড়া ফুসফুসে পানি জমা, রক্তক্ষরণ, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা কিংবা ডেঙ্গুর পাশাপাশি নিউমোনিয়ার মতো সংক্রমণ থেকেও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত স্যালাইন দেওয়ার কারণেও শরীরে তরল জমে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, কাশি ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট বা প্রধান লক্ষণ নয়। তবে জ্বরের সঙ্গে কাশি ও শ্বাসকষ্ট থাকলে ফুসফুসের সংক্রমণসহ অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির তীব্র বা একটানা পেটব্যথা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এর পাশাপাশি কয়েকটি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
এসব লক্ষণ শরীরে তরলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কিংবা গুরুতর ডেঙ্গুর ইঙ্গিত দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর সংকটকাল অনেক সময় জ্বর শুরুর তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে দেখা দেয়। বিশেষ করে জ্বর কমতে শুরু করার সময় রোগীর অবস্থা হঠাৎ খারাপ হতে পারে। তাই জ্বর কমে গেলেও সতর্কতা কমানো উচিত নয়।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন—
বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট কিংবা গুরুতর সতর্কসংকেত দেখা দিলে বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেওয়া বা নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগের কোন পর্যায়ে রয়েছেন, শারীরিক পরীক্ষা, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল বিবেচনা করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে হেমাটোক্রিট ও প্লাটিলেটের মাত্রাও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখে ডেঙ্গুর তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না। রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ডেঙ্গুতে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত স্যালাইন বা তরল দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে রোগীর শ্বাসকষ্ট কিংবা শরীরে তরল জমার লক্ষণ থাকলে তরল গ্রহণের পরিমাণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
জ্বর ও ব্যথা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেনসহ অন্যান্য এনএসএআইডি-জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ এসব ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডেঙ্গুতে সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সময়মতো বিপদের লক্ষণ শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু জ্বর কমেছে কি না, সেটি দেখলেই হবে না। রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস, পেটব্যথা, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
শ্বাসকষ্ট, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি কিংবা রক্তপাত দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।
চিকিৎসকের পরিচিতি: ডা. নওরোজ আহমেদ রায়হান, সহকারী অধ্যাপক (বক্ষব্যাধি মেডিসিন ও অ্যালার্জি, স্লিপ অ্যাপনিয়া বিশেষজ্ঞ)।
চেম্বার: আলোক হেলথকেয়ার, কচুক্ষেত শাখা, মিরপুর-১৪।
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯।