বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। উপজেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানো, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নতুন চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে চলতি অর্থবছরে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের মোট বরাদ্দের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা জানান।
জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ কমাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ জন্য ৪৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৫১ থেকে ১৫১ পর্যন্ত উন্নীত করা হবে। এ ছাড়া ৪৪৩টি উপজেলায় সমন্বিত বহুতল সেবাভবন নির্মাণ এবং ১৫টি উপজেলায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে অনেক এলাকার ৩০ ও ৫০ শয্যার হাসপাতাল দিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষের সেবা দিতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশের ৫০৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পূর্ণাঙ্গ ১৫১ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
উন্নীত হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), করোনারি কেয়ার, জরুরি চিকিৎসা, সার্জারি, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যানসার স্ক্রিনিং এবং ফিজিওথেরাপির মতো সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্ট্রোক ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসা এবং আধুনিক রোগনির্ণয় সুবিধাও যুক্ত করা হবে।
প্রাথমিক চিকিৎসা মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১৪ হাজার ৬৩৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হাব এবং ১ হাজার ৬৩১টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে সরকার।
এ জন্য ১১ হাজার ৯৯৩ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পুরোনো স্বাস্থ্যসেবা স্থাপনা সংস্কার, পুনর্নির্মাণ এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী সেবা দেবেন। তাঁরা অন্তত দুই মাস পরপর মানুষের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন।
বিশেষ করে রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট মোকাবিলায় চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকস, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের প্রথম আট মাসে কয়েক হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে পদায়ন করা হয়েছে।
আরও ২ হাজার ৫০০ নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। তাঁদের পাশাপাশি আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রথম ধাপে ৩০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
ক্যানসার চিকিৎসা ঢাকাকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও চালু করা হবে।
এ ছাড়া সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচটি ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (আইএনএমএএস) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
দেশে ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে ১৭টি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো পাঁচটি আধুনিক রোবোটিক সার্জারি মেশিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ক্যানসার চিকিৎসা কয়েকটি বড় শহরে সীমাবদ্ধ থাকায় অনেক রোগীকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। এতে তাঁদের চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াত খরচও বেড়ে যায়। রোগীদের বাড়ির কাছাকাছি উন্নত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়াতে সাভারে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করছে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
এ ছাড়া দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ও অকেজো যন্ত্রপাতি শনাক্ত করতে একটি নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। এসব সমস্যা সমাধানে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো উন্নয়ন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য শিগগিরই ১৬ হাজার কোটি টাকার দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়বে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় শহরের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।