
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে আইনি হয়রানির আশঙ্কায় আর পিছিয়ে থাকতে হবে না সাধারণ মানুষকে। আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা প্রাথমিক চিকিৎসায় সহায়তা করার কারণে উদ্ধারকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা করা যাবে না—এমন বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনের খসড়ায়।
প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এ ‘গুড সামারিটান’ বা মানবিক উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার ও হাসপাতালে নিতে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করা।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সময়কে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি ও গুরুতর শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তবে দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, মামলা কিংবা আদালতে হাজিরার মতো ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেকেই মানবিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও দ্বিধায় পড়েন।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সৎ উদ্দেশ্যে মানবিক বিবেচনায় দুর্ঘটনায় আহত কাউকে উদ্ধার করলে, প্রাথমিক সহায়তা দিলে কিংবা হাসপাতালে পৌঁছে দিলে সেই সহায়তার কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি বা মৃত্যুর জন্য তাকে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলায় দায়ী করা যাবে না।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ যেন আইনি জটিলতার ভয়ে পিছিয়ে না যায়, সে জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। গুড সামারিটান সুরক্ষার মাধ্যমে উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাহমিদুর রহমানের মতে, মানবিক কারণে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা দিলে উদ্ধারকাজে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত মানবিক সহায়তা, ইচ্ছাকৃত ক্ষতি এবং গুরুতর অবহেলার মধ্যে পার্থক্য আইনে স্পষ্ট করা জরুরি।
প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ জন্য কমিউনিটি ভলান্টিয়ার ও অ্যাম্বুলেন্স দল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এসব দল দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর ৩০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে।
পাশাপাশি আহত ব্যক্তিকে উপযুক্ত হাসপাতালে নেওয়া এবং গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার আওতায় আনার প্রস্তাবও রয়েছে।
বর্তমানে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৬২ ধারায় দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোটরযানের চালক, কন্ডাক্টর বা তাঁদের প্রতিনিধিকে দুর্ঘটনার খবর নিকটস্থ থানায় জানানো এবং আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
একই ধারায় দেশব্যাপী টোল-ফ্রি টেলিফোন নম্বর চালুর কথাও বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, চালক, মালিক ও যাত্রীরা জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবার সহায়তা চাইতে পারবেন।
নতুন আইনের খসড়ায় শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালকের ভুলকে দায়ী করলে হবে না। সড়কের নকশা, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহনের অবস্থা, গতিসীমা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ সব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রস্তাবিত আইনের অন্যতম লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভূমিকা রাখা।
সংশ্লিষ্টদের আশা, গুড সামারিটান সুরক্ষা কার্যকর হলে দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে সাধারণ মানুষের ভয় ও দ্বিধা কমবে। তবে এই আইনি সুরক্ষার অপব্যবহার ঠেকাতে সৎ উদ্দেশ্যে সহায়তার শর্ত এবং ইচ্ছাকৃত ক্ষতি বা গুরুতর অবহেলার ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণের বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
সূত্র: বাসস