
জমি কেনার পর দলিলে উল্লেখ করা পরিমাণের সঙ্গে খতিয়ানের হিসাব মিলছে না? কিংবা কাগজপত্রে জমির পরিমাণ ঠিক থাকলেও সরেজমিনে মাপজোখে পাওয়া যাচ্ছে কম? এমন সমস্যায় পড়লে অনেক জমির মালিকই বুঝতে পারেন না, কোথায় যোগাযোগ করবেন এবং কীভাবে সমস্যার সমাধান করবেন।
জমির দলিল, খতিয়ান ও বাস্তব পরিমাপের মধ্যে অসংগতি থাকলে ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, নামজারি, সীমানা নির্ধারণ কিংবা উত্তরাধিকার বণ্টন নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই শুরুতেই ভুলের ধরন শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সাধারণত কয়েকটি কারণে দলিল, খতিয়ান ও বাস্তব জমির পরিমাণে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
১. দলিলে লেখার ভুল: ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পাঁচ শতাংশ জমি বিক্রির চুক্তি হলেও অসাবধানতাবশত দলিলে ছয় শতাংশ লেখা হতে পারে। আবার দশমিকের ভুলেও জমির পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়।
২. খতিয়ানে ভুল তথ্য: জরিপের সময় জমির পরিমাপ, হিসাব কিংবা তথ্য লিপিবদ্ধ করার ভুলের কারণে খতিয়ানে জমির পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে। পুরোনো সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস রেকর্ডেও এমন অসংগতি থাকতে পারে।
৩. বাস্তবে জমি কম পাওয়া: দলিল ও খতিয়ানে জমির পরিমাণ ঠিক থাকলেও সরেজমিনে মাপজোখে কম জমি পাওয়া যেতে পারে। প্রতিবেশীর দখল, সীমানা নিয়ে বিরোধ কিংবা আগের জরিপের ভুল এর কারণ হতে পারে।
৪. বিক্রেতার মালিকানার চেয়ে বেশি জমি বিক্রি: কোনো ব্যক্তি নিজের মালিকানার চেয়ে বেশি জমি দলিলে উল্লেখ করলে শুধু দলিলে বেশি পরিমাণ লেখা থাকার কারণে ক্রেতা ওই জমির বৈধ মালিক হয়ে যান না। এ ক্ষেত্রে বিক্রেতার মালিকানার উৎস ও পূর্ববর্তী দলিল যাচাই করা প্রয়োজন।
দলিল তৈরির সময় প্রতারণা অথবা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পারস্পরিক ভুলের কারণে প্রকৃত চুক্তির প্রতিফলন না ঘটলে আদালতের মাধ্যমে দলিল সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৩১ ধারায় এ বিষয়ে বিধান রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত দলিল সংশোধনের নির্দেশ দিতে পারেন।
তবে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষ ভুল স্বীকার করলে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে সংশোধনী দলিল করার সুযোগ আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাচাই করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, কোনো পক্ষ ভুল স্বীকার না করলে কিংবা প্রতারণার অভিযোগ থাকলে আদালতের আশ্রয় নিতে হতে পারে।
নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ, মালিকের নাম কিংবা জমির হিসাব ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট এলাকার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে।
নামজারি-সংক্রান্ত ভুলের ধরন অনুযায়ী বিবিধ বা মিস মামলা করার সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৫০ ধারায় রাজস্ব কর্মকর্তা উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে নামজারি, জমাখারিজ ও জমা একত্রীকরণের আদেশ পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
এ জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করতে হয়। আবেদনে ভুলের বিবরণ, নিজের মালিকানা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র উল্লেখ করতে হবে।
অন্যদিকে, সর্বশেষ জরিপের চূড়ান্ত প্রকাশিত রেকর্ডে ভুল থাকলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৫এ ধারায় এ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রয়েছে। সাধারণভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা করতে হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিলম্বের কারণ গ্রহণযোগ্য হলে অতিরিক্ত সময়েও মামলা গ্রহণের সুযোগ থাকতে পারে।
জমি নিয়ে অনেকের ধারণা, নামজারি সম্পন্ন হলেই জমির মালিকানা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়।
নামজারি মূলত সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ এবং ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। নামজারি খতিয়ানে মালিকের নাম, মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও প্রাপ্য অংশের তথ্য থাকে।
কিন্তু নামজারি কোনো ত্রুটিপূর্ণ দলিলকে বৈধ করে না। একইভাবে অন্য কারও বৈধ মালিকানাও বাতিল করে না।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো জমির দলিলে ১০ শতাংশ উল্লেখ থাকলেও নামজারি খতিয়ানে আট শতাংশ থাকলে শুধু নামজারি করিয়ে বাকি দুই শতাংশের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আগে ওই জমির ওপর নিজের বৈধ মালিকানা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।
দলিল, খতিয়ান ও বাস্তব জমির পরিমাণে গরমিল দেখা দিলে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—
1. জমির মূল দলিল ও সার্টিফায়েড কপি।
2. বিক্রেতার পূর্ববর্তী মালিকানার দলিল বা বায়া দলিল।
3. সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ানের সার্টিফায়েড কপি।
4. সংশ্লিষ্ট দাগের মৌজা ম্যাপ বা নকশা।
5. নামজারি খতিয়ান ও নামজারি আদেশের কপি।
6. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
7. জমির দখল ও সীমানা-সংক্রান্ত প্রমাণ।
8. উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ ও বণ্টনসংক্রান্ত দলিল।
9. জমি মাপজোখের প্রতিবেদন বা নকশা।
জমি কেনার পর কাগজপত্রের ভুল সংশোধনের চেয়ে কেনার আগেই সব তথ্য যাচাই করা অনেক বেশি নিরাপদ।
প্রথমেই দলিলে উল্লেখ করা জমির পরিমাণের সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে নিতে হবে। শুধু বিক্রেতার দেওয়া দলিলের ওপর নির্ভর না করে পূর্ববর্তী দলিল ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া দাগ নম্বর ও মৌজা ম্যাপ যাচাই করতে হবে। অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে সরেজমিনে জমি মাপিয়ে নেওয়া ভালো।
জমির চারপাশের সীমানা—উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম—দলিলের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি কেনার ক্ষেত্রে বিক্রেতার প্রকৃত অংশ কত, অন্য ওয়ারিশদের অংশ কত এবং আগে কোনো অংশ বিক্রি করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, জমির দলিল, খতিয়ান ও বাস্তব পরিমাপের মধ্যে সামান্য অমিল থাকলেও তা অবহেলা করা উচিত নয়। জমি কেনার আগে কাগজপত্র যাচাই এবং সমস্যা দেখা দিলে ভূমি কার্যালয় ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই ভবিষ্যতের বিরোধ এড়ানোর সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।