
দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করলেও, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে তাদের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সাড়ে চার মাসেই ব্যাংকিং খাত থেকে বর্তমান সরকারের নেওয়া নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ পরিসংখ্যান ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করে দেশের মূলধারার অর্থনীতিবিদরা এই বিশাল অংকের ঋণের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। রাজস্ব ঘাটতি এবং আগের কিছু জরুরি দেনা মেটাতেই সরকারের এই ঋণপ্রবণতা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব (NBR Tax) আদায় না হওয়া এবং জরুরি বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ দেনা পরিশোধের কারণেই বর্তমান সরকারকে ব্যাংকিং খাতের ওপর এত বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। সাধারণত বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড এবং স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে এই ঋণ নিয়ে থাকে।
ঋণের সময়কাল: বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সাড়ে ৪ মাস।
মোট ঋণের পরিমাণ: ব্যাংকিং খাত থেকে সংগৃহীত নিট ঋণ প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকা।
প্রধান উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ।
মূল কারণ: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) বাস্তবায়ন, জরুরি জ্বালানি আমদানি এবং রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক মুদ্রানীতিতে (Monetary Policy) মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর ও সংকোচনমূলক নীতি বজায় রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের একচেটিয়া ঋণ গ্রহণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অতিরিক্ত তারল্য (Excess Liquidity) যদি সরকারই ঋণ হিসেবে নিয়ে নেয়, তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ পাবেন না। এর ফলে: ১. নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ২. বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ৩. উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের সামগ্রিক জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞ মন্তব্য:
"সরকারের ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে উৎপাদনশীল খাত সচল রাখতে হলে সরকারকে অবশ্যই এই ঋণের লাগাম টানতে হবে এবং ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়াতে হবে।"
চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের শুরুতে এই বিশাল অংকের ঋণ আগামী দিনগুলোতে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নামিয়ে আনা এবং ডলার সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের এই ঋণ নিয়ন্ত্রণ করাই এখন নতুন সরকারের অর্থনৈতিক টিমের প্রধান পরীক্ষা।