
নিউজ প্রোভাইডার
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য ও দ্বিমুখী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। সে সময় বিশ্ব রাজনীতির কূটকৌশলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান মূলত দুটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন মার্কিন সরকার ও হোয়াইট হাউস সরাসরি পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষে অবস্থান নিলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ, লেখক-বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যম এবং প্রভাবশালী সিনেটররা শুরু থেকেই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মুক্তিকামী বাঙালিদের পক্ষে।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর প্রচ্ছন্ন পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণকারী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার কৌশলগত কারণে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে অনড় ছিলেন। বাঙালিদের ওপর চালিত নির্মম সামরিক অভিযানের কথা জানা সত্ত্বেও নিক্সন প্রশাসন গোপনে পাকিস্তানকে আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও যুদ্ধবিমান সরবরাহ করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা চালায়। শুধু সামরিক সহায়তাই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়কে নস্যাৎ করার জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিল।
মার্কিন সরকারের এই অন্যায্য ও একপেশে নীতির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী সমাজ পাকিস্তানের বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। সে সময় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল 'আর্চার ব্লাড' ওয়াশিংটনে পাঠানো তাঁর ঐতিহাসিক টেলিগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতার সত্য চিত্র তুলে ধরেন। যদিও নিক্সন সরকার এই সত্য গোপন রাখতে তাঁকে দ্রুত প্রত্যাহার করে দেশে ফিরিয়ে নেয়।
এদিকে মার্কিন সরকারের প্রকাশ্য বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শনে আসেন এবং ওয়াশিংটনে ফিরে গিয়ে বাঙালিদের পক্ষে জোরালো জনমত গড়ে তোলেন। এর পাশাপাশি বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাইলফলক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ (Concert for Bangladesh) আয়োজন করেন জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবি শঙ্কর। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত এই ঐতিহাসিক কনসার্ট থেকে সংগৃহীত কোটি কোটি টাকার তহবিল বাংলাদেশের বিপন্ন শরণার্থীদের মানবিক সহায়তায় বিশাল ভূমিকা রাখে। মার্কিন প্রশাসনের অনীহা সত্ত্বেও আমেরিকার সাধারণ মানুষের এই নৈতিক, মানসিক ও আর্থিক সমর্থন অবরুদ্ধ বাঙালি জাতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ের মাঠে অসীম শক্তি জুগিয়েছিল।