
ফজলুল করিম সেখ
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং পুরো অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। দেশের ব্যাংকিং খাতের গড় মূলধন পর্যাপ্ততা হার (Capital to Risk-Weighted Assets Ratio বা CRAR) বর্তমানে নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ মানদণ্ড অনুযায়ী এই হার কমপক্ষে ১২.৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন।
অনেকের কাছে এটি হয়তো একটি প্রযুক্তিগত ব্যাংকিং সূচক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সিআরএআর হলো একটি ব্যাংকের আর্থিক সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। খেলাপি ঋণ, আর্থিক ক্ষতি বা অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন কতটা শক্তিশালী, সেটিই এই সূচকের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। আর সেই সক্ষমতাই এখন বড় ধরনের চাপে রয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মূলধন সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ প্রদানে আরও সতর্ক হবে। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন শিল্প স্থাপন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিনিয়োগের গতি কমে গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
একই সঙ্গে ব্যাংকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকতে পারে। এতে ব্যবসার ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত চাপ বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের। গাড়ি ঋণ, গৃহঋণ কিংবা ব্যবসায়িক ঋণ গ্রহণেও মানুষকে আরও কঠিন শর্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে। কারণ একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল হলে সেই দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। অন্যদিকে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাত্র দুই বছর আগেও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের গড় সিআরএআর ছিল ১১.৬৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে ৩.০৮ শতাংশে নেমে আসে এবং ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাংকিং খাতের মূলধন সক্ষমতায় বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে।
একই সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যাংকিং খাত তুলনামূলকভাবে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে—
🇮🇳 ভারত: ১৭.২%
🇵🇰 পাকিস্তান: ২০.৮%
🇱🇰 শ্রীলঙ্কা: ১৯.৪%
🇧🇩 বাংলাদেশ: -২.৬৪%
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণই এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থাকা অনেক ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসায় ব্যাংকগুলোর বাস্তব আর্থিক অবস্থাও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তবে সব ব্যাংকের অবস্থা এক নয়। দেশের কয়েকটি ব্যাংক এখনও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পর্যাপ্ত মূলধন সক্ষমতা বজায় রেখেছে। কিন্তু দুর্বল ব্যাংকগুলোর বড় মূলধন ঘাটতি পুরো ব্যাংকিং খাতের গড় অবস্থাকে ঋণাত্মক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কার্যকর তদারকি জোরদার করার বিকল্প নেই। সময়মতো প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে।
[এটি একটি ব্যক্তিগত ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে ব্যাংকিং সচেতনমূলক রিপোর্ট]