
খেলা যদি নির্ধারিত সময়ে টাই হয়, তবে অতিরিক্ত সময় (Extra Time) এবং পেনাল্টি শুট-আউট (Penalty Shootout) ছাড়া কি ফুটবল কল্পনা করা যায়? অধিকাংশ ফুটবলপ্রেমীর উত্তর হবে 'না'। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ৫৬ বছর বয়সী এক সাধারণ ফুটবল ভক্ত টিম ফারেল (Tim Farrell) এই ধারণাকেই চিরতরে বদলে দিতে চান। গত দুই দশক ধরে তিনি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে (FIFA) বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, টাই ভাঙার এই বর্তমান পদ্ধতিটি ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি পরিবর্তন করা দরকার।
ফারেল কোনো পেশাদার ফুটবলার বা কোচ নন, এমনকি ফুটবল ইন্ডাস্ট্রির কোনো কর্মকর্তাও নন। তিনি পেশায় একজন ভিডিও এবং মাল্টিমিডিয়া প্রোডাকশন কর্মী। জন্ম ও বেড়ে ওঠা অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসলে। তিনি স্থানীয় এ-লিগের ক্লাব নিউক্যাসল জেটসের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। ফিফার সদর দফতর সুইজারল্যান্ডের জুরিখ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসেও তিনি ফুটবলের এক বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন।
ফারেলের মতে, নকআউট ম্যাচে টাই ভাঙার বর্তমান পদ্ধতিটি তিনটি প্রধান কারণে ত্রুটিপূর্ণ: ১. অতিরিক্ত সময় বিরক্তিকর: এটি খেলোয়াড়দের ওপর অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। ২. ফুটবলের মূল চরিত্রের পরিপন্থী: পেনাল্টি শুট-আউটকে ফারেল মূল ফুটবল খেলার অংশ মনে করেন না, এটি অনেকটাই আলাদা একটি ইভেন্ট। ৩. একক ব্যর্থতার দায়: পেনাল্টি শুট-আউট মূলত একজন খেলোয়াড়ের ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করে। যে খেলোয়াড়টি পেনাল্টি মিস করেন, তাকে সারাজীবন এক বিশাল মানসিক বোঝা ও গ্লানি বয়ে বেড়াতে হয়। বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো বড় আসরে এই চাপ একজন মানুষের জন্য সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অনেকেই হয়তো জানেন না, ১৯৭০ সালের আগে ফুটবলে টাই ভাঙার পদ্ধতি ছিল আরও অদ্ভুত—হয় ম্যাচটি আবার খেলা হতো, অথবা টস বা লটারি করা হতো।
১৯৬৮ সালের অলিম্পিক কোয়ার্টার ফাইনালে ইসরায়েল ও বুলগেরিয়ার ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়। তখন মাঠের ভেতর মেক্সিকান ঐতিহ্যবাহী 'সোমব্রেরো' টুপির ভেতর দুটি কাগজের টুকরো রেখে লটারি করা হয়। ইসরায়েলের অধিনায়ক যে কাগজটি তোলেন তাতে লেখা ছিল "OUT" (বাদ)। ব্যস, লটারির ভাগ্যে বিদায় নেয় ইসরায়েল।
এই ঘটনার পর ক্ষুব্ধ হয়ে ইসরায়েলি ফুটবল সাংবাদিক জোসেফ দাগান এবং কর্মকর্তা মাইকেল আলমোগ মিলে ফিফার কাছে 'পেনাল্টি শুট-আউট'-এর লিখিত প্রস্তাব দেন। ১৯৭০ সালে আইএফএবি (IFAB) এটি অনুমোদন করে এবং ওই বছরই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও হাল সিটির মধ্যকার ম্যাচে ইতিহাসে প্রথম অফিশিয়াল পেনাল্টি শুট-আউট অনুষ্ঠিত হয়।
২০০৮ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল। মস্কোর তীব্র শীতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম চেলসির ম্যাচ। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র থাকার পর খেলা গড়ায় পেনাল্টিতে। চেলসির অধিনায়ক জন টেরি যখন চেলসিকে জেতানোর জন্য শেষ পেনাল্টিটি নিতে যান, তখন বৃষ্টির কারণে পিচ্ছিল মাঠে তিনি পিছলে যান এবং শটটি মিস করেন। এরপর নিকোলাস আনেলকাও মিস করলে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড চ্যাম্পিয়ন হয়।
মাঠে জন টেরির কান্নার সেই দৃশ্যটি ফারেলের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে। একজন নিরপেক্ষ দর্শক হিসেবেও তিনি মেনে নিতে পারেননি যে, এত বড় একটি টুর্নামেন্টের ভাগ্য একজনের এমন ট্রাজিক ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করবে। সেদিন থেকেই তিনি ফুটবলের এই নিয়ম বদলানোর প্রতিজ্ঞা করেন।
ফারেল কেবল ঘরে বসেই থাকেননি। তিনি একটি বিকল্প পরিকল্পনা (Alternative Plan) তৈরি করেছেন যা নিয়ে তিনি স্বয়ং জুরিখে ফিফার প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকও করেছেন। যদিও অনেকেই মনে করতে পারেন একজন সাধারণ মানুষের কথায় ফিফা নিয়ম বদলাবে না, কিন্তু ইতিহাস বলে—১৯৭০ সালেও একজন সাধারণ সাংবাদিকের চিঠির ওপর ভিত্তি করেই ফুটবলে পেনাল্টি শুট-আউট চালু হয়েছিল।
টিম ফারেল বিশ্বাস করেন, ফুটবলকে আরও সুন্দর ও মানবিক করতে পেনাল্টির চেয়েও ভালো কোনো বিকল্প অবশ্যই খুঁজে বের করা সম্ভব, যেখানে একক কোনো খেলোয়াড়কে ভিলেন হতে হবে না।
আপনার পোর্টালে প্রকাশের সুবিধার্থে শিরোনাম এবং সাব-হেডিংগুলো আকর্ষণীয় করে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আপনি এতে ছবি যুক্ত করতে পারেন।