
জর্জিয়ান যুগের লন্ডন কখনোই গণ-আন্দোলন বা জনতার ক্ষোভের বাইরে ছিল না। ১৭৬০-এর দশকের 'উইলকস অ্যান্ড লিবার্টি' আন্দোলন কিংবা ১৭৮০ সালের ক্যাথলিক-বিরোধী 'গর্ডন দাঙ্গা'র কথা ইতিহাসে বেশ জোরালোভাবেই গাঁথা আছে। তবে, ১৭৫৩ সালে ইহুদিদের নাগরিকত্ব (Jewish naturalisation) প্রদান সংক্রান্ত একটি বিলকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে অভূতপূর্ব আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল সত্যিই বিষ্ময়কর। লন্ডনের রাস্তায় তখন স্লোগান উঠেছিল, 'নো জিউস, নো উডেন শুজ' (No Jews, no wooden shoes)।
১২৯০ সালে রাজা প্রথম এডওয়ার্ড ইংল্যান্ড থেকে ইহুদিদের বিতাড়িত করেছিলেন। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী পর, ১৬৫৬ সালে অলিভার ক্রোমওয়েল তাদের পুনরায় প্রবেশের অনুমতি দেন। এরপর ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ইংল্যান্ড বিদেশিদের প্রতি কিছুটা নমনীয় হতে শুরু করে। ১৭৪০ সালে আমেরিকান উপনিবেশগুলোতে বসবাসরত বিদেশি প্রোটেস্ট্যান্টদের নাগরিকত্ব দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
১৭৫৩ সালে এসে প্রধানমন্ত্রী হেনরি পেলহাম এবং ডিউক অফ নিউক্যাসল টমাস পেলহাম ইহুদিদের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেন। তাদের প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়, ইহুদিরা চাইলে প্রচলিত অ্যাংলিকান রীতি বা খ্রিস্টান শপথ ছাড়াই পার্লামেন্টের কাছে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন। মূলত ইহুদি পুঁজিপতিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এই বিলটি আনা হয়েছিল। কিন্তু নিউক্যাসলের মতো দূরদর্শী রাজনীতিকও ঘুণাক্ষরে টের পাননি যে সামনে কী বিশাল ঝড় আসতে চলেছে!
পার্লামেন্টে ৭ জুলাই বিলটি ৯৬-৫৫ ভোটে পাস হলেও, আসল লড়াই শুরু হয় রাজপথে। এই বিলের বিরুদ্ধে এমন সব অযৌক্তিক ও হাস্যকর যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছিল যা আজকের দিনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে:
আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে বিরোধী দলগুলো এই ইস্যুটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। রাস্তায় ইহুদিদের অপমান ও আক্রমণ করা শুরু হয়। পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ রূপ নেয় যে, ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ আশঙ্কা করেছিলেন ইহুদিদের হয়তো শিগগিরই গণহত্যা করা হবে।
শেষ পর্যন্ত, পেলহাম ব্রাদার্স তাদের সাহস ধরে রাখতে পারেননি। নির্বাচনের কথা ভেবে তারা বিলটি বাতিল করতে বাধ্য হন এবং ১৭৫৩ সালের ২০ ডিসেম্বর এটি বাতিলের রাজকীয় সম্মতি লাভ করে। এই পুরো ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, একটি সাধারণ আইনি পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে, তার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় মানুষের কাল্পনিক ভয়। এই বিলটি পাস হলে ইংল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত মাত্র কয়েক ডজন ধনী ইহুদি পরিবার নাগরিকত্ব পেত; কিন্তু বিরোধীরা এটিকে রাষ্ট্রের খ্রিস্টান সংবিধান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছিল।
নৈতিক আতঙ্ক: জর্জিয়ান ইংল্যান্ডে ইহুদিবিদ্বেষ (Antisemitism in Georgian England)
১৭৫৩ সালে ইহুদিদের নাগরিকত্ব (Naturalisation) দেওয়া সংক্রান্ত একটি তুলনামূলক ছোট আইন পার্লামেন্টে উত্থাপিত হলেও, তা পুরো ইংল্যান্ডে অভূতপূর্ব বিতর্ক, গুজব ও জনরোষের জন্ম দেয়।
জর্জিয়ান যুগের লন্ডন কখনোই জনরোষ বা সহিংস গণআন্দোলন থেকে মুক্ত ছিল না। ১৭৬০-এর দশকের মাঝামাঝি ‘উইলকস অ্যান্ড লিবার্টি’ আন্দোলন এবং ১৭৮০ সালের গর্ডন দাঙ্গা, যা ছিল ক্যাথলিকবিরোধী সহিংসতা, ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি স্মরণীয়।
কিন্তু ১৭৫৩ সালে ইহুদিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রশ্নটি পুরো রাজনৈতিক সমাজের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। লন্ডনের রাস্তায় জনতা মিছিল করে স্লোগান দেয়—
"No Jews, no wooden shoes"
("ইহুদি নয়, কাঠের জুতা নয়")
এখানে কাঠের জুতা (wooden shoes) ছিল ফরাসি কৃষকদের প্রতীক এবং ক্যাথলিক শাসনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক ইঙ্গিত।
ইংল্যান্ডে ইহুদিদের অবস্থান
১২৯০ সালে রাজা এডওয়ার্ড প্রথম ইংল্যান্ড থেকে ইহুদিদের বহিষ্কার করেন।
পরবর্তীতে অলিভার ক্রমওয়েল ১৬৫৬ সালে তাদের আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসার অনুমতি দেন।
রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার (Restoration) পর দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির স্বার্থে বিদেশিদের ব্যাপারে আইন কিছুটা শিথিল করা হয়।
১৬৬৩ সালে নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন এনে কিছু দক্ষ বিদেশি কারিগর—যেমন সুতা ও ফ্ল্যাক্স প্রক্রিয়াজাতকারীদের—নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়া হয়।
এরপর ১৭৪০ সালে আরও বড় পরিবর্তন আসে।
সেই আইনে—
আমেরিকান উপনিবেশে বসবাসকারী বিদেশি প্রোটেস্ট্যান্টদের নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়া হয়।
ইহুদিদের ক্ষেত্রে খ্রিস্টীয় ধর্মীয় আচার পালনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়।
তাদেরকে আর খ্রিস্টান বিশ্বাসের নামে শপথ নিতে হতো না।
ফলে প্রায় ২০০ জন ইহুদি, যাদের বেশিরভাগই জ্যামাইকায় বসবাস করতেন, ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেন।
তখন পর্যন্ত বিষয়টি খুব বেশি বিতর্ক সৃষ্টি করেনি।
১৭৫৩ সালের নতুন আইন প্রস্তাব
১৭৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হেনরি পেলহ্যাম এবং তার ভাই ডিউক অব নিউক্যাসল-এর সরকার আরও বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
তাদের প্রস্তাব ছিল—
যেসব ইহুদি নিজেদের ধর্ম পালন করেন, তারা যেন অ্যাংলিকান চার্চের ধর্মীয় আচার পালন না করেও পার্লামেন্টের মাধ্যমে ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে দুটি বড় কারণ ছিল—
হুইগ দলের ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি।
লন্ডনের ধনী ইহুদি অর্থদাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যারা সম্পত্তি মালিকানার ওপর থাকা বৈষম্য দূর করতে চেয়েছিলেন।
এমনকি নিউক্যাসলও কল্পনা করতে পারেননি, এই বিলকে ঘিরে এত বড় বিতর্ক সৃষ্টি হবে।
পার্লামেন্টে বিতর্ক
বিলটি প্রথমে হাউস অব লর্ডস-এ খুব সহজেই পাস হয়ে যায়।
কিন্তু ১৬ এপ্রিল, হাউস অব কমন্সে বিতর্কের সময় পরিস্থিতি বদলে যায়।
কারণ সামনে সাধারণ নির্বাচন ছিল।
বিরোধী দল বুঝতে পারে, এই বিষয়টি সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বিপদে ফেলতে পারে।
স্যার এডমন্ড ইশাম অভিযোগ করেন—
এই আইন পাস হলে অসংখ্য বিদেশি ইহুদি ইংল্যান্ডে এসে কখনোই ব্রিটিশ সমাজে মিশে যাবে না।
স্যার জন বার্নার্ড বলেন—
এতে ইংরেজ ব্যবসা বিদেশিদের হাতে চলে যাবে এবং একসময় জমিদারিও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
অন্যদিকে লর্ড ডাপলিন যুক্তি দেন—
এতে বিদেশি পুঁজি ইংল্যান্ডে আসবে।
আর রবার্ট ন্যাজেন্ট বলেন—
ইংল্যান্ডে বসবাস করলে ইহুদিরা একসময় অ্যাংলিকান ধর্ম গ্রহণ করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী পেলহ্যাম শেষ বক্তব্যে বলেন—
ইংল্যান্ডে বসবাসরত ইহুদিদের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
পিটিশনের ঢল
এরপর একের পর এক আবেদন জমা পড়তে থাকে।
একদল ব্যবসায়ী বলেন—
এই আইন ধনী বিনিয়োগকারীদের ইংল্যান্ডে নিয়ে আসবে।
অন্যদিকে লন্ডন সিটির মেয়র ও কাউন্সিল দাবি করে—
এই আইন খ্রিস্টধর্মকে অপমান করবে এবং দেশের সাংবিধানিক কাঠামোকে দুর্বল করবে।
স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে ব্যবসা করা ব্যবসায়ীরাও আপত্তি জানান।
আবার ২০০-রও বেশি ব্যবসায়ী ও জাহাজ নির্মাতা আইনটির পক্ষে বলেন—
ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের অধিকার বিচার করা বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে।
সব বিতর্কের পরও ৭ জুলাই বিলটি ৯৬ বনাম ৫৫ ভোটে পাস হয়।
রাস্তায় শুরু হয় বিদ্বেষ
পার্লামেন্টে জয়ের পর বিরোধিতা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে।
গান, ব্যঙ্গচিত্র ও প্রচারপত্রে ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়।
একটি জনপ্রিয় ব্যঙ্গগানে বলা হয়—
"The Jews Naturalised; or the English Alienated"
অর্থাৎ—
"ইহুদিরা নাগরিকত্ব পেল, কিন্তু ইংরেজরা নিজেদের দেশেই পরবাসী হয়ে গেল।"
ইহুদিদের অপমান, হামলা ও হয়রানি বাড়তে থাকে।
পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে ওঠে যে ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ আশঙ্কা প্রকাশ করেন—
শিগগিরই ইহুদিদের গণহত্যা (massacre) হতে পারে।
গুজব ও ভয় ছড়িয়ে পড়ে
আইনটির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অদ্ভুত, ভিত্তিহীন ও পরস্পরবিরোধী দাবি ছড়িয়ে পড়ে।
যেমন—
মানুষ নাকি আর শূকরের মাংস (হ্যাম ও বেকন) খাবে না।
ইহুদিরা এত বেশি সংখ্যায় বেড়ে যাবে যে সব সরকারি চাকরি ও পেশা তাদের দখলে চলে যাবে।
ধনী ইহুদিরা সব বড় জমিদারি কিনে নেবে।
তারা নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করবে।
পার্লামেন্ট সদস্য হবে।
দেশের উচ্চপদে বসবে।
অন্যদিকে একই সঙ্গে দাবি করা হয়—
অসংখ্য দরিদ্র ইহুদি দেশে ঢুকে পড়বে।
দেশ দারিদ্র্যে ভরে যাবে।
সরকারি অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে।
একজন ব্যঙ্গকার ভবিষ্যতের কল্পিত সংবাদ লিখে বলেন—
সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালকে সিনাগগে পরিণত করা হয়েছে।
পন্টিয়াস পিলাতের মূর্তি লন্ডনে স্থাপন করা হয়েছে।
আরেকজন লেখক দাবি করেন—
এই আইন গোটা জাতির ওপর ঈশ্বরের অভিশাপ ডেকে আনবে।
শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটে
শেষ পর্যন্ত পেলহ্যাম সরকার রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে।
নিউক্যাসল প্রধানমন্ত্রীকে বোঝান—
আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে এই আইন রক্ষা করা সম্ভব নয়।
তাই এটি বাতিল করাই শ্রেয়।
আইন বাতিলের বিতর্কে আর্ল টেম্পল পার্লামেন্টে স্মরণীয় বক্তৃতা দেন।
তিনি বলেন—
পার্লামেন্টের উচিত জনতার অযৌক্তিক ভয় ও তাদের প্রভাবিতকারীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া।
কিন্তু তার কথা উপেক্ষিত হয়।
অবশেষে ২০ ডিসেম্বর রাজকীয় অনুমোদনের মাধ্যমে আইনটি বাতিল হয়ে যায়।
এই ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বাস্তবে এই আইনের মাধ্যমে মাত্র কয়েক ডজন ধনী ইহুদি পরিবার, যারা বহু বছর ধরেই ইংল্যান্ডে বসবাস করছিল, নাগরিকত্ব পেত।
কিন্তু বিরোধীরা এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিল যেন—
খ্রিস্টান রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে,
বিদেশিরা দেশ দখল করে নেবে,
জাতীয় পরিচয় হারিয়ে যাবে।
এই ঘটনা দেখায়, বাস্তবতার চেয়ে মানুষের কল্পিত ভয় ও গুজবই কখনো কখনো রাজনীতি ও জনমতকে বেশি প্রভাবিত করতে পারে।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭৫৩ সালের এই বিতর্ক ছিল এমন এক ধরনের "নৈতিক আতঙ্ক" (Moral Panic)-এর প্রাথমিক উদাহরণ, যেখানে অভিবাসন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে যে ভয় ও প্রচারণা দেখা গিয়েছিল, পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
| সাল | ঐতিহাসিক ঘটনা |
|---|---|
| ১২৯০ | রাজা প্রথম এডওয়ার্ড কর্তৃক ইংল্যান্ড থেকে ইহুদিদের বিতাড়ন। |
| ১৬৫৬ | অলিভার ক্রোমওয়েল কর্তৃক ইহুদিদের পুনরায় ইংল্যান্ডে প্রবেশের অনুমতি প্রদান। |
| ১৭৪০ | আমেরিকান উপনিবেশগুলোতে বসবাসরত বিদেশি প্রোটেস্ট্যান্ট ও কিছু ইহুদিকে নাগরিকত্বের ছাড়। |
| ১৭৫৩ (এপ্রিল-জুলাই) | পেলহাম ব্রাদার্স কর্তৃক 'জ্যু বিল' উত্থাপন এবং পার্লামেন্টে পাস। তীব্র জনরোষের শুরু। |
| ১৭৫৩ (২০ ডিসেম্বর) | তীব্র আন্দোলনের মুখে আইনটি বাতিল করে রাজকীয় সম্মতি প্রদান। |