
হলিউড তারকা জেনডায়া সম্প্রতি ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন চলচ্চিত্র 'দ্য ওডিসি'-র লন্ডন ফটোকলে ৩,০০০ বছরের পুরোনো ইরানি গোল্ড ডিস্ক দিয়ে তৈরি এক জোড়া কানের দুল পরে উপস্থিত হয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ১৮ ক্যারেট সোনা ও হীরে দিয়ে বাঁধানো এই প্রাচীন অলংকারটি সম্প্রতি তৈরি করেছেন রত্নশিল্পী গ্লেন স্পিরো (Glenn Spiro) এবং এটি বর্তমানে 'ব্যারন লন্ডন' (Barron London) জুয়েলারি হাউসের নিজস্ব সংগ্রহের অংশ। তবে ফ্যাশন দুনিয়ায় আলোড়ন ফেললেও এটি সাধারণ কোনো গহনা বিতর্ক নয়; বরং এটি বৈশ্বিক আর্ট মার্কেটের বছরের পর বছর ধরে প্রাচীন ঐতিহাসিক বস্তুকে কেটেকুটে বিলাসবহুল পোশাকে রূপান্তরের এক ভয়ংকর নৈতিক সংকটের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
সাধারণত ফ্যাশন সমালোচকরা এই ধরনের সাজপোশাক নিয়ে মন্তব্য করলেও, এবার প্রথম প্রতিবাদ এসেছে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের কাছ থেকে। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ইতিহাসবিদরা অভিযোগ তুলেছেন যে, ৩,০০০ বছরের প্রাচীন কোনো ঐতিহাসিক সম্পদকে জাদুঘরের কাঁচের ভেতরে গবেষণার জন্য না রেখে ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করা সেটির বাণিজ্যিকীকরণ ও প্রদর্শনকামী রূপ। ইতোমধ্যেই 'ফরেনসিক আর্কাইভ অফ ইরান' ডিস্কগুলোর আসল উৎস ও মালিকানার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে একটি পিটিশন চালু করেছে।
তদুপরি, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের এই চরম মুহূর্তে জেনডায়ার এই পোশাক নির্বাচনকে চরম সংবেদনহীনতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। লেখক জিরার আলী যেমনটি উল্লেখ করেছেন, পশ্চিমা বিনোদন জগত প্রায়শই গ্লোবাল সাউথ বা প্রাচ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির নৈতিক প্রশ্নের ক্ষেত্রে 'বধির' ভূমিকা পালন করে।
রত্নশিল্পীরা এই রূপান্তরকে 'প্রাচীন সাম্রাজ্যের পুনর্জন্ম' হিসেবে বর্ণনা করলেও গবেষকদের মতে এটি ইতিহাসের ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়া কিছুই নয়।
ব্যারন লন্ডন এই দুলটিকে খ্রিস্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দের ইরানের 'জিউই গোল্ড মেডেলিয়ন প্লাক' (Ziwiye gold medallion plaques) হিসেবে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। ১৯৪৭ সালে উত্তর-পশ্চিম ইরানের কুর্দিস্তানে স্থানীয় গ্রামবাসীদের দ্বারা আবিষ্কৃত 'জিউই গুপ্তধন'-এর সাথে এটি সম্পর্কিত। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের আগেই স্থানটি ব্যাপকভাবে লুণ্ঠিত হয়েছিল। ফলে বাজারে ঘুরে বেড়ানো এসব জিনিসের কতটা আসল উৎস থেকে এসেছে তা বলা কঠিন।
এমন ঘটনা আর্ট মার্কেটে নতুন নয়। এর আগে বিখ্যাত 'বারাকাত গ্যালারি' আফ্রিকার সোঙ্গি ও লুবা সম্প্রদায়ের ১৯ শতকের পবিত্র কাঠের মূর্তির ওপর আধুনিক রঙ দিয়ে উচ্চমূল্যে বিক্রি করেছিল। এমনকি ২০০৫ সালে ইরানের জিরোফ্ট অঞ্চলের লুণ্ঠিত প্রত্নসম্পদ নিয়ে যুক্তরাজ্য হাইকোর্টে মামলা করে নিজেদের ঐতিহাসিক অধিকার পুনরুদ্ধার করতে হয়েছিল। কেবল "প্রাচীন" (Ancient) ট্যাগ লাগিয়ে লুণ্ঠিত বা অবৈধভাবে আনা ইতিহাসকে এভাবে বিলাসবহুল পণ্যে রূপান্তর করা নৈতিকভাবে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দেয়।
| বিষয় | প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ (Preservation) | বাণিজ্যিক রূপান্তর (Repurposing) |
|---|---|---|
| মূল উদ্দেশ্য | ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য রক্ষা | ফ্যাশন অনুষঙ্গ ও বিলাসবহুল পণ্য তৈরি |
| ভৌত পরিবর্তন | বস্তুর মূল গঠন অপরিবর্তিত রাখা | কাটিং, ড্রিলিং ও পলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থায়ী পরিবর্তন |
| উৎসের স্বচ্ছতা | কঠোর ডকুমেন্টেশন ও গবেষণা | অস্পষ্ট উৎস, লুণ্ঠিত ইতিহাস আড়াল করার ঝুঁকি |