
নিউজ প্রোভাইডার
সম্প্রতি খুলনার পাইকগাছায় পিকনিকের আয়োজন ঘিরে এক অভূতপূর্ব ও উদ্বেগের ঘটনা ঘটে। কড়াইয়ে রান্নার চড়ানো লালচে গরুর মাংস তাপে ধীরে ধীরে নীলচে-সবুজ রূপ ধারণ করায় তৈরি হয় তীব্র আতঙ্ক। ক্রেতা ও বিক্রেতার বাগ্বিতণ্ডা গড়ায় পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—মাংস কি পচে গিয়েছিল, নাকি মেশানো হয়েছিল ক্ষতিকারক কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক?
সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছে—রান্না করা গরুর মাংস কি সত্যিই সবুজ হয়ে যেতে পারে? কিংবা মাংস সবুজ হওয়া মানেই কি তা ভেজাল, পচে যাওয়া বা বিষাক্ত?
তবে আতঙ্ক বা গুজবে কান না দিয়ে আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলো (যেমন USDA) এবং রন্ধনবিজ্ঞানের দিকে নজর দিলে এই অদ্ভুত ঘটনার পেছনে সুনির্দিষ্ট ৪টি বৈজ্ঞানিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায়:
বিজ্ঞান ও খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংসের রং সবুজ হওয়ার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করতে পারে:
অনেক সময় রান্না করা বা প্রক্রিয়াজাত মাংসের ওপর আলো পড়লে সেটি সবুজ, নীল বা রংধনুর মতো চকচকে দেখায়। এটি কোনো কেমিক্যাল, কেমিক্যাল ভেজাল বা পচনের লক্ষণ নয়। মাংস পেশির তন্তুর (Muscle fibers) মধ্য দিয়ে আলো যাওয়ার সময় যখন বিচ্ছুরিত (Diffraction) হয়, তখন দৃষ্টিভ্রমের কারণে চোখ মাংসটিকে সবুজ বা চকচকে দেখে। এই ঘটনাটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'ইরিসাইডেন্স' বা আলোর প্রতিসরণ।
রান্নায় ব্যবহৃত কিছু মশলা (যেমন কাঁচা মরিচ, অতিরিক্ত ধনেপাতা বা হলুদ-মরিচের গুঁড়োর বিশেষ বিক্রিয়া) এবং মাংসে থাকা আয়রন বা হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন অক্সিডেশনের ফলে মাংস সাময়িকভাবে সবুজ বা গাঢ় বর্ণ ধারণ করতে পারে।
গরুর মাংসে স্বাভাবিকভাবেই ‘মাইওগ্লোবিন’ নামের প্রোটিন ও আয়রন (লোহা) থাকে। মাংস সংরক্ষণে সামান্য তাপমাত্রার হেরফের হলে বা প্রাকৃতিকভাবে সালফারের উপস্থিতি বাড়লে রান্নার তাপে মাইওগ্লোবিন ও সালফার যুক্ত হয়ে তৈরি করে ‘সালফমাইওগ্লোবিন’। এই নতুন রাসায়নিক যৌগের রঙই মূলত গাঢ় সবুজ বা ধূসর। ফলে তাপে হঠাৎ পুরো কড়াইয়ের মাংস সবুজ আভা ধারণ করতে পারে।
তবে মাংস যদি রান্নার আগেই অনেকক্ষণ ধরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খোলা রাখা হয় বা নষ্ট হতে শুরু করে, তবে Pseudomonas বা Leuconostoc জাতীয় কিছু ব্যাকটেরিয়ার নিঃসৃত রাসায়নিকের কারণেও প্রোটিন ভেঙে হাইড্রোজেন সালফাইড তৈরি হয়। এই রাসায়নিক হিমোগ্লোবিনের সাথে যুক্ত হয়ে 'সালফমাইওগ্লোবিন' (Sulfmyoglobin) তৈরি করে, যা স্পষ্ট সবুজ রঙের সংকেত দেয়।
খাদ্য বিজ্ঞানীদের মতে, আলো বিচ্ছুরণের কারণে যদি মাংস সবুজ বা চকচকে দেখায় এবং তা থেকে কোনো বাজে গন্ধ না বের হয়, তবে তা সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু যদি রান্নার পর কিংবা আগে মাংস থেকে দুর্গন্ধ বের হয়, পিচ্ছিল হয়ে যায় এবং রঙের স্পষ্ট পরিবর্তন ঘটে, তবে বুঝতে হবে তা ব্যাকটেরিয়াজনিত পচনের শিকার এবং তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
খুলনার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে খাদ্যের নমুনা ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এলেই জানা যাবে খুলনার সেই সবুজ মাংস আলো বিচ্ছুরণ নাকি অন্য কোনো উপাদানের কারণে রূপ বদলেছিল!