
নিউজ প্রোভাইডার
কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (FSRU) আকস্মিক কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের জের ধরে দেশজুড়ে মারাত্মক রূপ নিয়েছে গ্যাস সংকট। জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ একলাফে কমে যাওয়ার ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ গৃহস্থালি গ্রাহক থেকে শুরু করে গণপরিবহন ও শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে আরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লেগে যেতে পারে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও শিল্প এলাকায় গৃহস্থালি গ্রাহকদের রান্নাবান্নার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, ধানমন্ডি, রামপুরা এবং কেরানীগঞ্জের মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ শূন্য থেকে নিবুনিবু অবস্থায় নামছে।
ফলে বিকল্প হিসেবে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে এলপিজি সিলিন্ডার, ইলেকট্রিক ইনডাকশন চুলা কিংবা মাটির চুলা ও খড়ি-লাকড়ির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অনেক পরিবারে সময়মতো রান্না করা সম্ভব না হওয়ায় নিয়মিত হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকে বাড়তি খরচে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পর্যাপ্ত প্রেশার বা গ্যাসের চাপ না থাকায় রাজধানীর অধিকাংশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যে কয়েকটি স্টেশনে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে গ্যাস নেওয়ার আশায় শত শত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা, এমনকি সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে রাইড শেয়ারিং ও সিএনজি চালকদের দৈনিক আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে, যা সরাসরি তাদের রুটিরুজির ওপর প্রভাব ফেলছে।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প খাতগুলোতে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও টঙ্গীর পোশাক, টেক্সটাইল, ডাইং এবং সিরামিক কারখানাগুলোতে যেখানে ৪০ থেকে ৫০ পিএসআই (PSI) গ্যাসের চাপের প্রয়োজন, সেখানে নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ৪ পিএসআই-এ। কারখানা সচল রাখতে ও আন্তর্জাতিক অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করার লক্ষ্যে বাধ্য হয়ে উদ্যোক্তারা মহার্ঘ ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করছেন। এতে কারখানাগুলোর সার্বিক উৎপাদন খরচ একলাফে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বিনষ্ট করছে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ১,৫০০ মেগাওয়াটের বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের গ্রামাঞ্চলে নতুন করে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার কারণে সরকারি সার কারখানাগুলোতেও সার উৎপাদন থমকে গেছে, যা কৃষি খাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির আশঙ্কাকে বাড়াল।