
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা নতুন করে চরম রূপ নিয়েছে। ইরাকে অবস্থানরত ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী 'পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস' (পিএমএফ)-এর একাধিক ঘাঁটিতে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এ হামলায় অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত এবং আরও ৩২ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেনটকম) জানিয়েছে, সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরান ও তাদের অনুগত গোষ্ঠীগুলোর চালানো ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কঠোর জবাব হিসেবেই এই যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সেনটকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ৭২ ঘণ্টায় ইরান নির্দেশিত ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার জবাবে পূর্ব ইরাকের একাধিক অস্ত্রাগার ও লজিস্টিক সাইটে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরাকের বাগদাদ, ওয়াসিত, নিনাওয়া, বসরা, কিরকুক, কারবালা এবং দিয়ালা প্রদেশের পিএমএফ ঘাঁটিতে এই যৌথ হামলা চালানো হয়। পিএমএফ সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের নিনাওয়া এবং মধ্যাঞ্চলের দিয়ালা প্রদেশে বিমান হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটেছে।
পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ): ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে স্বীকৃত প্রধানত শিয়া-ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি যৌথ জোট, যা ইরানের প্রত্যক্ষ সমর্থনে পরিচালিত হয়ে আসছে।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে সবকটি ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে বলে জানানো হয়।
জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের এই হামলার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন:
"আমেরিকান বাহিনী ওদের ওপর তীব্র আঘাত হানবে। ওরা এমন এক শিক্ষা পাবে যা দীর্ঘদিন মনে রাখবে।"
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে সফল আঘাত এনেছে। একই সাথে, প্রণালী পার হওয়ার সময় সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার অভিযোগে হরমুজ প্রণালীতে তিনটি তেল ট্যাঙ্কারে হামলা চালানোর দাবিও করেছে আইআরজিসি।
ইরাক সরকার: ইরাকের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও পিএমএফ এ হামলাকে ইরাকের সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, এটি দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর একটি "কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলা"। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই সামরিক অভিযান ইরাকি সরকারের সমন্বয়েই পরিচালিত হয়েছে।
ইরান পরোক্ষ হুশিয়ারি: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে। এর যেকোনো ভয়াবহ পরিণতি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বহন করতে হবে।
ইরাকে হামলা ও হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫% বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলে ৮৮.৫০ ডলারে পৌঁছেছে।
| অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু | বর্তমান অবস্থা |
| হরমুজ প্রণালী | যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত ও অবরুদ্ধ |
| আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার | সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দামে হঠাৎ বড় লাফ |
| আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি | জর্ডান, ইরাক ও সৌদি আরবের মার্কিন ও স্থানীয় প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা |
আঞ্চলিক এই আঞ্চলিক সংঘাত ও মার্কিন-সৌদি যৌথ হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।