
বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলোর মালিকানার অংশীদারিত্ব (স্টেক) বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার এক বিতর্কিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা এই পরিকল্পনাকে ইনফান্তিনো "ফুটবলের গণতন্ত্রায়ন" হিসেবে আখ্যা দিলেও ফুটবল বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও গুঞ্জন।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং কোটি কোটি সমর্থক এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছেন। তবে বিতর্ক সত্ত্বেও নিজের অবস্থান এবং ফিফার ভেতরে একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ইনফান্তিনো এই পদক্ষেপে অনড়।
ইনফান্তিনোর প্রস্তাবনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে ফিফার অন্তর্ভুক্ত ২১১টি সদস্য দেশের প্রত্যেকটিকে "ফুটবলের উন্নয়নের জন্য" অতিরিক্ত ২ কোটি ডলার (২০ মিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি) বরাদ্দ দেওয়া হবে।
পিছিয়ে পড়া বা ছোট ফুটবল দেশগুলোর জন্য এটি এক বিশাল আর্থিক সুযোগ। কারণ অনেক দেশের বার্ষিক আয়ের চেয়ে এই অর্থ অনেক বেশি। ফিফার নীতি অনুযায়ী যেকোনো সাধারণ প্রস্তাবে অর্ধেকের বেশি (সরল সংখ্যাগরিষ্ঠতা) ভোট পেলেই সিদ্ধান্ত পাশ হয়ে যায়। আফ্রিকা, এশিয়া এবং আমেরিকার ছোট দেশগুলোর বড় সমর্থক গোষ্ঠী ইনফান্তিনোর পেছনে থাকায় এই প্রস্তাব পাশ করিয়ে নেওয়া খুব একটা কঠিন হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই বিতর্কিত পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনেরা:
থ্রাইভ ক্যাপিটাল (Thrive Capital): প্রস্তাবিত বিনিয়োগ তহবিলের নেতৃত্বে রয়েছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশ কুশনার।
গ্রেগ মাফেই (Greg Maffei): ফর্মুলা ওয়ানের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তা ও ট্রাম্পের অনুদানকারীকে ফিফার "প্রধান বাণিজ্যিক উপদেষ্টা" হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইনফান্তিনো দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন—বিশ্বকাপ ট্রফি ওভাল অফিসে রাখা, ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফার কার্যালয় খোলা এবং ট্রাম্পকে 'শান্তি পুরস্কার' দেওয়ার মতো ঘটনা এর প্রমাণ। এই সম্পর্কের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়েই ইনফান্তিনো ফুটবলের বড় অংশ বেসরকারি ফান্ডে হস্তান্তর করতে যাচ্ছেন।
ফিফার শাসন সংক্রান্ত কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মিগুয়েল মাদুরো এই প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি একে "আইনসিদ্ধ ঘুষ" (Legalised Bribe) বলে অভিহিত করেছেন।
মাদুরোর মতে:
"ফিফা একটি রাজনৈতিক কার্টেলের মতো কাজ করে। এটি অনুদান ও স্বজনপ্রীতির ওপর টিকে আছে। সদস্য দেশগুলোকে যে টাকা ফিফা দেয়, তা সত্যিই ফুটবলের মূলে পৌঁছায় কি না—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।"
প্রাইভেট ইকুইটি বা বেসরকারি বিনিয়োগ মার্কিন খেলাধুলা বা ইউরোপের লা লিগা ও লিগ ১-এ আগেই প্রবেশ করেছে। তবে ফিফার মতো অলাভজনক (Non-profit) আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্বকাপ বিক্রির এই পদক্ষেপ ফুটবলকে বাণিজ্যিক মুনাফাভিত্তিক সংস্থায় রূপান্তর করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিকল্পনার ফলে ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো এবং উয়েফা (UEFA) সভাপতি আলেকজান্ডার সেফেরিনের দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। উয়েফা মনে করছে, ফিফার নতুন 'ক্লাব বিশ্বকাপ' এবং বিশ্বকাপের শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ তাদের ঐতিহ্যবাহী চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ইউরোপীয় ফুটবলের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি হুমকি।
ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, উয়েফাভুক্ত কয়েকটি দেশ বিশ্বকাপ বয়কটের চিন্তাভাবনাও করছে। ইউরোপীয় পরাশক্তিদের ছাড়া বিশ্বকাপ আয়োজন করা ফিফার জন্য অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে। তবে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে স্পেন ও পর্তুগাল মূল আয়োজক হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কতটুকু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
আফ্রিকা, এশিয়া ও আমেরিকার বিপুল ভোটে ভর করে জিয়ানি ইনফান্তিনো এই সিদ্ধান্ত পাশ করিয়ে নিতে পারেন বলেই মনে করা হচ্ছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা কোটি কোটি ডলার মুনাফা করার সুযোগ পাবে এবং ইনফান্তিনো ফিফায় নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা স্থায়ী করে নেবেন। তবে এর বিনিময়ে ঐতিহ্যবাহী বিশ্ব ফুটবলের মূল কাঠামো কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটাই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।