
ইউগান্ডার প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ও চারবারের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কিজা বেসিগ্যে (৭০) রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় আদালত কক্ষে বিচার চলাকালীন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ঢলে পড়েছেন। বর্তমানে রাজধানী কামপালার মুলাগো ন্যাশনাল রেফারেল হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় বেসিগ্যের স্ত্রী এবং জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক সংস্থা ইউএনএআইডিএস-এর প্রধান উইনি বিয়ানইমা জানান, "তিনি বর্তমানে অচেতন অবস্থায় রয়েছেন, কথা বলতে পারছেন না এবং যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতির প্রতিক্রিয়া জানাতেও অক্ষম।"
আদালতের প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তার জন্য আইনজীবী নিয়োগের চেষ্টা করা হলে বেসিগ্যে তা জোর প্রতিবাদ জানান। আইনজীবী ছাড়া তাকে বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করার প্রতিবাদে তিনি চিৎকার করে বলেন—"থামুন, এই অন্যায় বন্ধ করুন!" এর কিছুক্ষণ পরই তিনি কাঁপতে কাঁপতে ডকে ঢলে পড়েন।
বেসিগ্যের স্ত্রী বিয়ানইমা অভিযোগ করেন, বেসিগ্যে ঢলে পড়ার মুহূর্তে কঁকিয়ে উঠে বলছিলেন যে তিনি আঘাত পাচ্ছেন। আদালত কক্ষে উপস্থিত তার বোন ডক্টর অলিভ কোবুসিংয়ে (যে একজন পেশাদার চিকিৎসক) তাৎক্ষণিকভাবে তার কাছে যেতে চাইলেও কারা নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে বাধা দেয়। পরবর্তীতে কারা প্রহরী ও নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
বর্তমানে আইসিইউ উইংটিকে ঘিরে রেখেছে সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষীরা। উইনি বিয়ানইমা জানিয়েছেন, জীবনের নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে বেসিগ্যে সরকারি চিকিৎসকদের কোনো সেবা নিতে রাজি নন। তিনি নিজস্ব ব্যক্তিগত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর তার বোন ও ব্যক্তিগত চিকিৎসককে আইসিইউতে তার কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, গত কয়েক মাস ধরে আটক থাকার কারণে বেসিগ্যের স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। চলতি বছরের শুরুতে এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনশনের কারণেও তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল।
ইউগান্ডার দীর্ঘদিনের শাসক প্রেসিডেন্ট ইওওয়েরি মুসেভেনির সাবেক ব্যক্তিগত চিকিৎসক বেসিগ্যে ১৯৯৯ সালে তার সাথে সম্পর্ক ছেদ করে বিরোধী রাজনীতিতে আসেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রতিবেশী দেশ কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি থেকে তাকে নাটकीयভাবে অপহরণ করে ইউগান্ডায় ফিরিয়ে আনা হয়।
এরপর তার ও তার সহযোগী ওবায়েদ লুতালের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং মুসেভেনি সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। ইউগান্ডার আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহ একটি চরম অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
আইনি লড়াই চলাকালে গত মাসে বেসিগ্যের মূল আইনজীবী এরিয়াস লুকওয়াগোকে সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তার অপর কেনীয় আইনজীবী মার্থা কারুয়াকে ইউগান্ডায় প্রবেশেই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
আদালতে বেসিগ্যের ঢলে পড়ার ঘটনাকে ইউগান্ডার অপর বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ববি ওয়াইন "মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন" বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে বেসিগ্যের ছেলে অ্যাডাম আম্পা ইউগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইওওয়েরি মুসেভেনি এবং তার ছেলে সেনাপ্রধান জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবার উদ্দেশ্যে বলেন, "রাজনীতি যা-ই হোক না কেন, কোনো সন্তানেরই উচিত নয় নিজ পিতাকে এমন করুণ অবস্থায় দেখা। মানবিকতার খাতিরে তাকে মুক্তি দিন।"
মানবাধিকার সংস্থা ও দেশীয় বিরোধীদের পক্ষ থেকেও তাকে দ্রুত মানবিক ভিত্তিতে ও চিকিৎসা সুবিধা দিতে মুক্তির জোর দাবি জানানো হচ্ছে।