
সুদীর্ঘ যুদ্ধ, চরম ক্ষয়ক্ষতি এবং পারস্পরিক চরম অবিশ্বাসের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে একটি নজিরবিহীন চিলতে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গাজায় অস্ত্রসংবরণে সম্মত হয়েছে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। সাবেক ও বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত 'বোর্ড অব পিস' (Board of Peace) পরিকল্পনার আওতায় এই সমঝোতা চূড়ান্ত করার দিকে এগোনো হচ্ছে।
তবে এই প্রস্তাবটি দেখতে সহজ মনে হলেও, বাস্তবতার জমিনে যুদ্ধ বিরতি ও নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও রক্তক্ষয়ী রাজনীতির মুখোমুখি।
পরিকল্পনার মূলে রয়েছে একটি দ্বিপক্ষীয় ভারসাম্য:
হামাস তার অস্ত্রভাণ্ডার হস্তান্তর ও সশস্ত্র সক্ষমতা ত্যাগ করবে।
জবাবে ইসরায়েল গাজার যে ৭০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে দখল করে আছে, সেখান থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে।
কিন্তু গাজায় ২৪ লক্ষাধিক সাধারণ মানুষের ধ্বংসস্তূপের জীবন, শূন্যের কোঠায় নামা পারস্পরিক ট্রাস্ট এবং হাজার হাজার প্রাণহানির বাস্তবতা এই প্রক্রিয়াকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী (যা জাতিসংঘ নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করে), যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলি হামলায় ৭০,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধবিরতির পরও প্রাণ হারিয়েছেন আরও এক হাজারের বেশি মানুষ। ইউনিসেফের (UNICEF) মতে, নিহতদের মধ্যে ২০,০০০-এর বেশি শিশু রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১,০০০ দুগ্ধপোষ্য শিশু ও নবজাতক।
গাজার বড় একটি অংশ এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ। এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল বোমাবর্ষণের ফল নয়; ইসরায়েলি বেসামরিক ঠিকাদারদের দিয়ে অবকাঠামো ও লোকালয় স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রকল্প চালানো হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের বড় একটি অংশ এবং মিশর ও জর্ডানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেন, ইসরায়েলি সরকারের চরমপন্থী অংশটি এমন পরিবেশ তৈরি করছে যেন ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ভূখণ্ড ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়—যা কার্যত এক ধরণের 'এথনিক ক্লিনসিং' বা জাতিগত নিধন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রায় ৮০ শতাংশ ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্র ও শক্তিহীন না করা পর্যন্ত তাদের অস্তিত্বের সংকট দূর হবে না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন আক্রমণে প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত হয় (যার দুই-তৃতীয়াংশই বেসামরিক) এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। ইসরায়েলিদের ভয়—সুযোগ পেলেই হামাস আবারও একই ধরনের হামলা চালাবে।
এই সমঝোতা কোন বিচ্ছিন্ন পরিবেশে ঘটছে না। এর পেছনে কাজ করছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ:
নেতানিয়াহুর রাজত্ব ও বিচারিক অস্তিত্ব: ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনে পিছিয়ে আছেন। তিনি কেবল ক্ষমতার জন্যই লড়ছেন না, দুর্নীতি মামলার সম্ভাব্য জেলদণ্ড এড়াতে সময় ক্ষেপণ করছেন। তিনি দেশীয় চরমপন্থীদের সন্তুষ্ট রাখা এবং ওয়াশিংটনের চাপ সামলানোর দ্বিমুখী খেলায় ব্যস্ত।
মার্কিন রাজনীতি ও ট্রাম্পের তাগিদ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী (Midterm) নির্বাচন আসন্ন। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ না জিতে মার্কিন প্রেসে সাফল্য দেখানোর জন্য ট্রাম্পের গাজায় একটি বড় জয় দরকার। নেতানিয়াহু এই চুক্তিতে বাধা দিলে ট্রাম্প তার ওপর ক্ষুব্ধ হতে পারেন।
ইসরায়েলি ধারাবাহিক বিমান হামলায় শীর্ষ নেতৃত্ব ও হাজার হাজার যোদ্ধা হারিয়ে হামাস এখন চরম কোণঠাসা। তা সত্ত্বেও সংগঠনটি গাজায় তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। কোরআন মুখস্থকরণ কর্মসূচি এবং ত্রাণ বিতরণের মাধ্যমে তারা যুবসমাজ ও শিশুদের মাঝে অবস্থান তৈরি করছে।
হামাসের নতুন রাজনৈতিক প্রধান খলিল আল-হায়্যা এই নিরস্ত্রীকরণ প্রস্তাবে রাজি হওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছেন। এই কঠিন কূটনীতিতে পর্দার আড়াল থেকে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে মিশর ও তুরস্ক।
গাজায় শান্তির আলোচনা চললেও দখলীকৃত পশ্চিম তীর এখন বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা ACLED-এর মতে, ২০২৬ সালটি গত এক দশকের মধ্যে পশ্চিম তীরের সবচেয়ে সহিংস বছর হতে চলেছে।
ইসরায়েলি সরকারের উগ্রপন্থী অংশ (যেমন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ) নতুন বসতি স্থাপন নিশ্চিত করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকেই নস্যাৎ করতে চাচ্ছেন। স্মোট্রিচকে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ইউরোপের একাধিক দেশ ও অস্ট্রেলিয়া নিষিদ্ধ করেছে।
ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না দিলে কেবল সামরিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি আনতে পারবে না। ধাপভিত্তিক কূটনৈতিক অগ্রগতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা না থাকলে এই চুক্তিটি কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে—যার ফলশ্রুতিতে আরও একটি প্রজন্মকে সইতে হবে যুদ্ধের নির্মমতা।