
উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় (Ceuta) মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীর একযোগে প্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ভেতরে তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইইউ-র কয়েকটি দেশের প্রতিক্রিয়াকে "স্বার্থপর, মেরুকরণকারী এবং বেআইনি" বলে আখ্যা দিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা জানান, সেউতার সীমান্ত পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এবং অনুপ্রবেশকারীদের অধিকাংশকেই ইতিমধ্যে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে জলে-স্থলে এই বিপজ্জনক সীমান্ত পারাপারের চেষ্টা করতে গিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৭ জনে দাঁড়িয়েছে। নতুন করে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ উপকূলে ভাসমান বেলুন বা ইনফ্লেটেবল সামুদ্রিক ব্যারিয়ার তৈরির কাজ শুরু করেছে।
অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের এই ঘটনাকে "সংকটজনক" আখ্যা দিয়ে ইতালি স্পেনের সাথে সীমান্তমুক্ত 'সেনগেন' (Schengen) চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করে। ইতালির এই পদক্ষেপকে ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক সমর্থন জানায় এবং চেক প্রজাতন্ত্র স্পেনের সেনগেন সদস্যপদ স্থগিতের দাবি তোলে।
এর জবাবে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনকে লেখা এক চিঠিতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, স্পেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সীমান্ত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং মূল ভূখণ্ড ইউরোপে অবৈধ যাতায়াত বন্ধ করেছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, সেউতা মূল সেনগেন অঞ্চলের অংশ নয়।
সানচেজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ধরনের স্বার্থপর, মেরুকরণকারী ও বেআইনি প্রতিক্রিয়া বরদাশত করতে পারে না।" রাজনৈতিক স্বার্থ, কুসংস্কার ও ভুয়া খবরের ওপর ভিত্তি করে কিছু দেশ স্পেনের ওপর দায় চাপাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী ইইউ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে বাহ্যিক সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যৌথ দায়িত্ব পুনর্ব্যক্ত করা যায়। পাশাপাশি ইইউ-র ২২টি দেশও পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জরুরি আলোচনার তাগিদ দিয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন সেউতার দৃশ্যকে "অগ্রহণযোগ্য" উল্লেখ করে বলেন, "নিয়ম না মেনে কাউকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করতে দেওয়া যায় না।" তবে একই সঙ্গে স্পেন ও মরক্কোর যৌথ প্রচেষ্টায় দ্রুত ফেরত প্রক্রিয়া চালুর প্রশংসা করেন তিনি।
স্পেন সরকার সেউতা ও আরেক এনক্লেভ মেলিয়ার নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, অতিরিক্ত পুলিশ, ড্রোন ও নৌযান মোতায়েন করেছে। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ জানান, মানব পাচারকারী মাফিয়া চক্র স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, গত জুনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, সমুদ্রে ধরা পড়া অভিবাসীদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া দ্রুত ফেরত পাঠানো যাবে না। এই রায়কে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে পাচারকারীরা তরুণদের উৎসাহিত করে।
বর্তমানে সেউতার মাটিতে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও অভিবাসন নীতি ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিভাজন নতুন করে প্রকাশ্যে এল।