
গাজা সিটি, খান ইউনিস ও দেইর আল-বালাহে ইসরায়েলি বিমান হামলায় শিশুসহ নিহত ১৩।
হামাস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস'-এর কাছে অস্ত্র সমর্পণে রাজি হওয়ার পরপরই এ হামলা চালাল ইসরায়েল।
ইসরায়েলের দাবি, হামাসের ৩ কমান্ডারের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করতেই এই লক্ষ্যভিত্তিক হামলা।
গাজায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র ত্যাগের রোডম্যাপ গ্রহণ করার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে আবারও ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এতে বেশ কয়েকজন শিশুসহ অন্তত ১৩ জন ফিলিস্তینی নিহত হয়েছেন। টানা দ্বিতীয় রাতের মতো চলা এই হামলায় গাজার অবকাঠামো ও আবাসিক ভবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আইডিএফ যুদ্ধবিমান থেকে গাজা সিটি, খান ইউনিস এবং দেইর আল-বালাহের একাধিক আবাসিক এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনে হামলায় এক শিশুসহ দুইজন নিহত হন। উত্তরাঞ্চলীয় জাবালিয়ার কাছে পৃথক হামলায় নিহত হয়েছেন আরও একজন।
খান ইউনিসের একটি বসতবাড়িতে চালানো বিমান হামলায় এক বাবা-মা এবং তাদের নয় বছর বয়সী শিশু সন্তান প্রাণ হারান। অন্যদিকে দেইর আল-বালাহে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে হামলায় এক পুরুষ ও এক নারী নিহত হন। গত অক্টোবরে ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত ১,১০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) মুখপাত্র জানান, গাজায় সামরিক শক্তিবৃদ্ধি ও হামলার পরিকল্পনায় যুক্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা কমান্ডোদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছিল। এতে হামাসের দুই জন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে—যাদের একজন এলিট 'নুখবা' ফোর্সের এবং অন্যজন 'মাগাজি ব্যাটালিয়ন'-এর। এছাড়া উত্তরাঞ্চলীয় জাবালিয়া ব্যাটালিয়নের আরও এক হামাস সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করে আইডিএফ।
এদিকে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি হয়নি। বর্তমানে গাজার প্রায় ৭০% এলাকা ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন:
"হামাস যদি সম্পূর্ণ অস্ত্র পরিত্যাগ না করে, তবে পুরো গাজা ভূখণ্ড ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়বে।"
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তিকমিটিতে ইসরায়েলের পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ রয়েছে, যার সাথে কোহেনের বক্তব্যের সুস্পষ্ট বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ইসরায়েলের চরমপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতমার বেন গভিরও ট্রাম্পের এই খসড়া প্রস্তাবকে "অগ্রহণযোগ্য" বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেন যে, তার গঠিত 'বোর্ড অব পিস' (Board of Peace) গাজায় হামাসসহ সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর "সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ"-এর একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের দাবি, ইসরায়েল এই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট।
এই চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের অংশ হিসেবে প্রকাশিত ১৫ দফার নতুন রোডম্যাপে বলা হয়েছে:
অস্ত্র মজুদ ও ধ্বংস: ভারী অস্ত্র তালিকাভুক্তকরণ, সামরিক কারখানা, অস্ত্রের গুদাম ও সুরঙ্গগুলো পুরোপুরি খালি ও ধ্বংস করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রযুক্তিবিদদের হাতে ক্ষমতা: হামাস ক্ষমতা হস্তান্তর করতে সম্মত হওয়া ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটি (স্বাধীন প্রযুক্তিবিদদের একটি দল)-র কাছে সমস্ত ভারী সামরিক সরঞ্জাম তুলে দেওয়া হবে।
পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যাহার: এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে এবং এর সাথে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়টিও যুক্ত থাকবে।
তবে কায়রো থেকে কাজ করা এই স্বাধীন ফিলিস্তিনি কমিটি এখনো গাজায় প্রবেশ করতে পারেনি এবং চুক্তি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
জাতিসংঘ ও স্যাটেলাইট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোতে ১,৫০০টিরও বেশি ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষের ফলে গাজায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ কোটি টন ধ্বংসাবশেষ (Debris) জমা হয়েছে।
গাজায় চলমান এই সংঘাত বন্ধে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও রোডম্যাপ তৈরি হলেও, বাস্তবে বিমান হামলা ও প্রাণহানি অব্যাহত থাকায় স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে।