
মরক্কো ও স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল ‘সেউতা’ (Ceuta) সীমান্তে ফের দেখা দিয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা ও মানবিক সংকট। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে সাঁতরে ও স্থলপথে স্পেনের এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু এই ব্যাপক অনুপ্রবেশের নেপথ্যে কেবল উন্নত জীবনের স্বপ্নই নয়, জড়িয়ে রয়েছে দুই দেশের জটিল ভূরাজনীতি, সীমান্তরক্ষীদের রহস্যজনক ভূমিকা এবং বেশ কিছু মৃত্যুর বিভীষিকা।
চার দিন আগে ৪৪ বছর বয়সী মরক্কোর নাগরিক ইউসেফ এল আব্বাস জানতে পারেন, প্রায় ৪০০ জন মানুষ মরক্কো থেকে সাঁতরে জিব্রাল্টার প্রণালীর উপকূলে অবস্থিত স্পেনের ছিটমহল সেউতায় পৌঁছে গেছেন।
চার সন্তানের জনক ইউসেফ ২০১৯ সালে স্পেনের বিলবাও শহরে কাজ হারানোর পর রেসিডেন্সি মেয়াদ শেষ হওয়ায় মরক্কোতে ফেরত আসেন। সাত বছর ধরে পরিবার ছেড়ে আলাদা থাকা ইউসেফের কাছে এটি ছিল স্পেনে ফিরে যাওয়ার এক অপ্রত্যাশিত সুযোগ।
ইউসেফ যখন ট্যাক্সি নিয়ে সীমান্ত শহর ফিনাইদেকের (Fnideq) দিকে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি দেখতে পান যে সাধারণত নথিপত্র ছাড়া ইউরোপীয় সীমান্তে যেতে না দেওয়ার যে কঠোর চেকপোস্টগুলো থাকে, সেগুলো অলৌকিকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে।
“আগের রাতেও যে মরক্কোর পুলিশ মানুষকে পিটিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছিল, পরদিন সকালেই তারা চিৎকার করে বলছিল— ‘যাও, যাও! দৌড়ে স্পেনে ঢুকে পড়ো!’ কিছুই মাথায় আসছিল না,” বলেন ইউসেফ।
তবে এই ছাড় কেবল মরক্কোর নাগরিকদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। সাব-সাহারান আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের শক্ত হাতে হটিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
বুধবার দুপুর পৌনে ৩টায় সীমান্তে পৌঁছান ইউসেফ। সীমান্ত পার হতে তার মাত্র পাঁচ মিনিটের মতো সাঁতার কাটতে হয়েছিল। কিন্তু এই পাঁচ মিনিটেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন এক ভয়াবহ দৃশ্য।
“পানিতে থাকা মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে আমি চারজনের মরদেহ ভাসতে দেখি। মানুষ পানি থেকে লাশ তুলে আনছিল।”
প্রতিবেদনে জানা গেছে, সীমানা পেরোতে গিয়ে পদদলিত হয়ে এবং ডুবে গিয়ে কমপক্ষে ৭২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
সেউতায় এই রেকর্ডসংখ্যক অনুপ্রবেশের পর স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ একে “স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর সরাসরি আঘাত” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মাদ্রিদের দাবি, মানব পাচারকারী চক্র স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়ের সুযোগ নিয়ে অভিবাসীদের উস্কানি দিয়েছে। অন্যদিকে, ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মরক্কো ইচ্ছা করেই সীমান্ত শিথিল করে দিয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি আলজেরিয়া সফর করায় মরক্কো তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতেই এই 'সীমান্ত কার্ড' ব্যবহার করেছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের মে মাসেও পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে স্পেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মরক্কো একইভাবে দু'দিনের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিল, যার ফলে ১০,০০০ মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছিল।
স্পেন সীমান্তে পৌঁছানোর পর ইউসেফকে উদ্ধারে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল স্প্যানিশ গার্ডিয়া সিভিলের এক সদস্য। কিন্তু পরবর্তীকালে অন্যান্য অভিবাসীদের সঙ্গে তাকেও আবার তল্লাশির নামে মারধর করা হয়।
১৪ বছর স্পেনের হসপিটালিটি সেক্টরে কাজ করা ইউসেফের স্ত্রী ও চার কন্যা এখনও বিলবাওতেই বসবাস করছেন। মরক্কোতে বাবার সাথে টুকটাক মোবাইল মেরামতের কাজ করে দিন চালানো ইউসেফ আক্ষেপ করে বলেন:
“আমি স্পেনে ফেরার স্বপ্নদেখা কখনো থামাইনি। মরক্কোতে আমি বেঁচে ঠিকই ছিলাম, কিন্তু সত্যি বলতে ওটা কোনো জীবন ছিল না।”
বর্তমানে হাজার হাজার অভিবাসী সেউতার পার্ক, রাস্তা ও ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, স্পেন কর্তৃপক্ষ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করে শত শত মানুষকে পুনরায় মরক্কোতে ফেরত পাঠানো শুরু করেছে।