বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, তাঁদের মৌলিক ও মানবাধিকারের সার্বিক সুরক্ষা, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের নতুন অঙ্গীকার নিয়ে আজ ৯ আগস্ট (রবিবার) সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে 'আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬'।
বিশ্বের ৯০টি দেশের প্রায় ৪৭ কোটি ৭০ লাখের বেশি আদিবাসী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভূমি রক্ষা এবং তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানাতে প্রতি বছর এই দিবসটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।
দিবসটির বৈশ্বিক পটভূমি ও ইতিহাস
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বকীয়তা রক্ষা ও মানবাধিকার সুসংহত করার লক্ষ্যে ১৯৮২ সালের ৯ আগস্ট সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অধীনে গঠিত 'আদিবাসী জনসংখ্যা বিষয়ক কার্যদল' (Working Group on Indigenous Populations)-এর প্রথম ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পরবর্তীতে, আদিবাসী মানুষের সংগ্রাম ও বিশ্বজুড়ে তাঁদের অবদানের কথা স্মরণে রেখে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (UN General Assembly) প্রতি বছর ৯ আগস্টকে 'আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস' হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় 'আদিবাসী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক ঘোষণা' (UNDRIP), যা আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করে।
২০২৬ সালের মূল প্রতিপাদ্য: প্রথাগত চিকিৎসা ও জীবনের প্রাচীর
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬-এর প্রধান আলোকপাত করা হয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রথাগত স্বাস্থ্যসেবা, ঐতিহ্যবাহী ঔষধি জ্ঞান এবং জীবন সুরক্ষায় তাঁদের প্রথাগত ভূমিকার ওপর।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আদিবাসী সমাজ প্রকৃতির সাথে নিবিড় বন্ধন বজায় রেখে ঐতিহ্যবাহী গাছগাছড়া ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে যে অনন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা ও জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জ্ঞান ধরে রেখেছে, তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানেও বড় ভূমিকা রেখে আসছে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে আদিবাসীদের এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাঁদের সংরক্ষিত ভূ-প্রকৃতির প্রথাগত রক্ষকের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ
বিশ্বে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশের কম হলেও, বিশ্বের চরম দরিদ্র মানুষের প্রায় ১৫ শতাংশই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যালোচনায় দেখা যায়, এখনও বিশ্বের বহু অঞ্চলে আদিবাসীরা নিচের সংকটগুলোর মুখোমুখি হচ্ছেন:
১. ভাষা ও সংস্কৃতি বিলুপ্তি: বিশ্বজুড়ে বিপন্ন ভাষার তালিকায় অধিকাংশ ভাষাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। নিয়মিত চর্চা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক ভাষা বিলুপ্তির পথে।
২. ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে উচ্ছেদ: নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী জমি, বন ও জলাশয়ের অধিকার হারানো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে আদিবাসী আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া অন্যতম প্রধান সংকট।
৩. সামাজিক প্রান্তিকতা: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানে আদিবাসীদের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় সামাজিক বৈষম্য রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে পালিত নানা বর্ণাঢ্য কর্মসূচি
বাংলাদেশেও সমতল ও পাহাড়ের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, সামাজিক সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা এবং উন্নয়ন অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে পালন করা হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকা সহ রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও দিনাজপুরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক উৎসব, প্রথাগত পোশাক পরিধান, লোকজ খেলাধুলা এবং স্মারক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। আজ বিভিন্ন আলোচনা সভা থেকে বক্তারা আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার সুসংহত করা, শিক্ষা ব্যবস্থায় মাতৃভাষায় পাঠদান নিশ্চিত করা এবং আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদের সঠিক বাস্তবায়নের জোর দাবি পুনর্ব্যক্ত করছেন।