ইনফরমেশন প্রোভাইডার
সাবেক সচিব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ এফ এম সোলায়মান চৌধুরী বলেছেন নেতৃত্ব বা ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হলো ন্যায়পরায়ণতা এবং মানবিক আচরণ। কর্মক্ষেত্রে বা পরিবারে দায়িত্বশীল পদে আসীন ব্যক্তি যখন অধীনস্থ কর্মচারীদের মৌলিক চাহিদা পোশাক ও খাবারের ক্ষেত্রে বৈষম্য রেখে বড় বড় নীতিবাক্য শোনান, তখন তা কেবল কপটতাই প্রকাশ করে না, বরং প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। সত্যিকারের নেতৃত্ব হলো কাজের মাধ্যমে আদর্শ স্থাপন করা, কেবল মুখের কথায় নয়।
কর্মচারীদের শোষণ করে বা তাদের ন্যায্য পাওনা না দিয়ে সততা, নিষ্ঠা বা সেবার বুলি আউড়ানো চরম ভণ্ডামি। যতক্ষণ না একজন নেতা তার অধীনস্থদের মৌলিক চাহিদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে পারছেন, ততক্ষণ বড় বড় কথা না বলে, সেই বৈষম্য দূর করাই হওয়া উচিত প্রধান কাজ। মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক আচরণই একটি সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধ সমাজ বা প্রতিষ্ঠান গড়ার চাবিকাঠি।
১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান ডমিনেশন ফাউন্ডেশন ও জিএন এন টিভি-২৪ এর আয়োজনে “বাংলাদেশী শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের ভূমিকা” শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এ কথা বলেন। ১লা মে বিকেল ৪.০০ ঘটিকায় বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ মিলনায়তনে সংগঠনের সভাপতি, গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান ডমিনেশন ফাউন্ডেশন ও জিএন এন টিভি-২৪ চেয়ারম্যান কবি আব্দুল্লাহ আল মামুন এর সভাপতিত্বে ও মীম আখতার এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে উদ্বোধক হিসাবে বক্তব্য রাখেন, নজরুল গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান, প্রধান বক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ন বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্র চিন্তক, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হামদুল্লাহ আল মেহেদী, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, সাংগ্রাম জাতীয় কমিটির মহাসচিব ও পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দীন চৌধুরী, রাষ্ট্র চিন্তক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব নুরুজ্জামান হিরা, নিউজ টেন অনলাইন এর প্রকাশক মোঃ তানভীর আজাদ, লেখক, গবেষক, অভিনেতা, মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব এ্যাডভোকেট লুৎফর অহসান বাবু, বাংলাদেশ মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ পরিষদ এর নির্বাহী পরিচালক ও মহাসচিব তালুকদার মনিরুজ্জামান মনির , ভিশন বাংলাদেশ এনজিও এর চেয়ারম্যান মোরছালীন ইসলাম বাবু, বিশেষ আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন, গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান ডমিনেশন ফাউন্ডেশন এর মহাসচিব, ও জিএন এন টিভি-২৪এর এমডি কে এম জসিম উদ্দীন, গ্লোবাল লেবার এন্ড হিটম্যান ডমিনেশন ফাউন্ডেশন এর যুগ্ম-মহাসচিব ও ডিএমডি, জিএন এন টিভি-২৪ ফজলুর রহমান পলাশ, রাস্ট্রচিন্তক এম এ জলিল, মোস্তাক ভাষানী, কবি নাসরিন খান, আবৃত্তিকার মরিয়ম সাথী, লাবন্য সীমা বিশেষ আলোচক ছিলেন মোঃ মিলাদ মিয়া সহযোগী সম্পাদক (বার্তা বিভাগ) জিএন এন টিডি-২৪, প্রমূখ।
প্রধান আলোচক হামদুল্লাহ আল মেহেদী বলেন, আমাদের সমাজে পেশাজীবী সংগঠনগুলোতে (যেমন- বার কাউন্সিল, মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন, প্রেস ক্লাব) সাধারণত ওই পেশার ব্যক্তিরাই নেতৃত্ব দেন। ডাক্তারদের নেতা ডাক্তার, আইনজীবীদের নেতা আইনজীবী এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, যখনই শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়নের কথা আসে, তখন চিত্রটি পুরোপুরি বদলে যায়। সেখানে শ্রমিকরা প্রায়শই নিজেদের নেতা হিসেবে উঠে আসতে পারেন না, বরং বহিরাগত বা পেশাদার রাজনৈতিক নেতারা নেতৃত্বের আসন দখল করে রাখেন।
হামদুল্লাহ আল মেহেদী আরো বলেন, বাংলাদেশে শ্রমিক সংগঠনগুলো শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠন হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক দলগুলো চায় তাদের মতাদর্শের অনুসারী লোকই শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করুক। যখন কোনো শ্রমিক নেতা হয়ে ওঠেন, তখন তিনি রাজনৈতিক দলের চেয়ে শ্রমিকদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন—এই ভয়ে রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমিকদের নেতৃত্বের মূলধারায় আসতে নিরুৎসাহিত করে।
হামদুল্লাহ আল মেহেদী আরো বলেন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব শ্রমিকদের হাতে না থাকা শ্রমিক আন্দোলনের জন্য একটি বড় দুর্বলতা। যতদিন পর্যন্ত শ্রমিকরা নিজেদের সংগঠনের নেতৃত্ব নিজেরা গ্রহণ করতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত শ্রমিকদের শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। শ্রমিকদের শিক্ষিত করা, শ্রম আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন নিশ্চিত করাই হতে পারে এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান বলেন, শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা একমাত্র ইসলামী শ্রমনীতির মধ্যেই নিহিত তিনি বলেন সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত মেহনতি মানুষের রক্ত-ঘামেই গড়ে উঠেছে দালানকোঠা, কলকারখানা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অবকাঠামো। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যুগে যুগে শ্রমিকরা অবহেলিত, শোষিত ও বঞ্চিত হয়েছে। পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র শ্রমিকদের কাজের মজুরি দিলেও তাদের মানবিক মর্যাদা ও প্রকৃত অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। এই বৈষম্যমূলক পরিস্থিতিতে, ইসলামই একমাত্র জীবনব্যবস্থা, যা চৌদ্দশ বছর পূর্বে শ্রমিকের মর্যাদা, অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও ন্যায়ভিত্তিক শ্রমনীতি প্রদান করেছে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক, যাতে তার পরিবার স্বচ্ছলভাবে জীবনধারণ করতে পারে।
মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান আরো বলেন, শ্রমিক কোনো দাস নয়, বরং মালিকের ভাই। তাদের সাথে কঠোর আচরণ করা নিষিদ্ধ। ইসলামের নির্দেশ হলো, মালিক যা খাবে ও পরবে, শ্রমিককেও তাই খাওয়াবে ও পরাবে। শ্রমিকের সামর্থ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। যদি কাজ কষ্টসাধ্য হয়, তবে মালিককে তা সহজ করার বা সাহায্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।কাজ শুরু করার পূর্বেই কাজের ধরন ও পারিশ্রমিক পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
কাজের ফাঁকে যেন শ্রমিকরা নিজ নিজ ধর্ম মত নামায ও অন্যান্য ইবাদত ঠিকমতো করতে পারে, সে সুযোগ নিশ্চিত করা মালিকের দায়িত্ব।
মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান আরো বলেন,শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় ইসলামী শ্রমনীতি হলো সর্বোত্তম, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক সমাধান। আজকের শোষণ ও বৈষম্যমূলক সমাজে শ্রমিকদের প্রকৃত মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হলে ইসলামের এই মহান শিক্ষাগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করা অপরিহার্য। শ্রমিকদের কেবল ‘শ্রমের মেশিন’ না ভেবে মানুষ হিসেবে যথাযথ সম্মান ও প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়াই ইসলামী শ্রমনীতির মূল লক্ষ্য।
বিশেষ অতিথি এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সস্তা শ্রমের কারণে কক্সবাজারসহ আশেপাশের এলাকার স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, মজুরি এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। স্থানীয় লেবার বা দিনমজুররা তাদের নিজেদের এলাকাতেই পরবাসী হয়ে পড়ছে এবং কাজ হারিয়ে চরম সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী আরো বলেন, ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের তুলনায় অনেক কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি হয়। ফলে, কৃষি জমি, নির্মাণ কাজ এবং অন্যান্য দিনমজুরি খাতে স্থানীয় শ্রমিকদের পরিবর্তে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক স্থানীয় নারী ও পুরুষ বেকার হয়ে পড়ছেন।
এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী আরো বলেন, রোহিঙ্গারা কম মজুরিতে কাজ করায় স্থানীয় শ্রমবাজারে শ্রমের দাম বা মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। স্থানীয় শ্রমিকরা আগে যে মজুরি পেতেন, এখন তার চেয়ে অনেক কম টাকায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, অথবা কাজ পাচ্ছেন না।
স্থানীয় শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়ায় তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সস্তা শ্রমের প্রতিযোগীতার মুখে তারা টিকতে পারছে না, যা স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরো ভঙ্গুর করে দিয়েছে।
স্থানীয় যুব ও নারীরা কাজের সুযোগ হারিয়ে হতাশায় ভুগছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে অসন্তোষ তৈরি করছে।
তিনি আরো বলেন রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক ইস্যু নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। রোহিঙ্গাদের জন্য কম মজুরিতে কাজ করার প্রবণতা স্থানীয় শ্রমিকদের চরম বিপাকে ফেলেছে, যা নিরসনে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ।
সভাপতির বক্তব্যে কবি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, শ্রমীক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠায় গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এবং জিএনএন টিভি ২৪ কে সততার সহিত কাজ করতে হবে। সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষে কাজ করলে বাধা এবং বিতর্ক আসবেই। শ্রমিক শ্রেণী এবং নিপিড়ীত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাধা আসলে তা সাংগঠনিক ভাবে মোকাবিলা করা হবে।