আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট টোমোকো আকানে এবং জ্যেষ্ঠ বিচার আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়েকে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন।
মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ নিষেধাজ্ঞাকে আইসিসিকে “ধ্বংস” করার প্রচারণার অংশ বলে অভিহিত করেছেন।
রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসি প্রেসিডেন্ট টোমোকো আকানে এবং জ্যেষ্ঠ বিচার আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে আমাদের অটল লক্ষ্যে—আমেরিকানদের এই ভুয়া আদালত থেকে রক্ষা করা।”
তিনি আরও লেখেন, “আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সম্মানে, আমেরিকানদের কখনোই মিথ্যা অপরাধের বিচারের জন্য সমুদ্রপারে নিয়ে যাওয়া হবে না।”
নিষেধাজ্ঞার আওতা
জাপানি বিচারক আকানে ২০২৪ সালের মার্চে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আইসিসির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেয়ে আদালতের একজন সেনেগালিজ আইনজীবী।
এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে তাদের যেকোনো সম্পদ জব্দ হবে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের লেনদেন সীমিত থাকবে।
জাপানের প্রতিক্রিয়া
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আকানে ও সেয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে “খুবই দুর্ভাগ্যজনক” বলে মন্তব্য করেছে।
মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “জাপান ধারাবাহিকভাবে আইসিসিকে সমর্থন করে আসছে, যেটি একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে কাজ করে।”
আইসিসির প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এক ডজনেরও বেশি আইসিসি বিচারক ও কৌঁসুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অনেকাংশ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজসহ মানবাধিকার সংগঠন ও ব্যক্তিদের ওপরও আইসিসির সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত জুনে তিন আইসিসি বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করে এই নিষেধাজ্ঞাকে আদালতের বিচারিক স্বাধীনতা খর্ব করার “স্বেচ্ছাচারী ও খামখেয়ালিপূর্ণ” পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন।
আইসিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, “আইন প্রয়োগের জন্য যখন বিচারকদের হুমকি দেওয়া হয়, তখন আন্তর্জাতিক আইনি শৃঙ্খলাই ঝুঁকিতে পড়ে।”
নেদারল্যান্ডসের অবস্থান
আদালতটির আয়োজক দেশ নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন বলেছেন, সর্বশেষ মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে তার দেশ অনুমোদন করে না এবং তিনি আকানেকে “আমাদের অব্যাহত সমর্থন নিয়ে আলোচনার” জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
তিনি লেখেন, “আন্তর্জাতিক আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোকে অবশ্যই তাদের ম্যান্ডেট স্বাধীনভাবে পালন করতে দিতে হবে।”
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য যুক্তি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে আইসিসি তার এখতিয়ার অতিক্রম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কেউই হেগ-ভিত্তিক এই আদালতের সদস্য নয়।
তবে সমর্থকেরা বলছেন, আদালতের ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রে সংঘটিত কর্মকাণ্ড তদন্ত ও বিচারের এখতিয়ার আদালতের রয়েছে, এমনকি অপরাধীরা সদস্যপদের বাইরে হলেও।
নেতানিয়াহুর প্রশংসা
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক পোস্টে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়ে আইসিসিকে “একটি ক্যাঙ্গারু আদালত, যা আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার ঢাকে” বলে মন্তব্য করেছেন।
মানবাধিকার সংগঠনের নিন্দা
গত সপ্তাহে চারটি মানবাধিকার সংগঠন আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনায় নিউইয়র্কের একটি আদালতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করে। তারা বলেছে, এই পদক্ষেপ যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
মামলাকারী সংগঠনগুলোর একটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) মঙ্গলবার নতুন নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
এইচআরডব্লিউর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের পরিচালক বালকিস জারাহ বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা “আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের চরম অবজ্ঞার সর্বশেষ উদাহরণ এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করার একটি প্রকাশ্য প্রচেষ্টা”।
