
স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
রাষ্ট্রীয়বাদী চেতনায় বিশ্বাস করা মানে শুধু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করা নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রকৃতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখাও প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্র তখনই সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হতে পারে, যখন তার প্রাকৃতিক পরিবেশ সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। আজ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, নদী দূষণ ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দেশপ্রেমের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হলে আমাদের সবাইকে গাছ লাগানোর আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে। একটি গাছ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রীয়বাদী দায়িত্ববোধ থেকে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, পরিবেশ ধ্বংস হলে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক ও কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের প্রকৃতি ও কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড়, খরা, অতিবৃষ্টি ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ ক্রমেই বাড়ছে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় গাছই সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তাই প্রতিটি নাগরিকের উচিত রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অংশ হিসেবে অন্তত একটি করে গাছ লাগানো।
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ফলজ গাছ একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূলভিত্তি। যে রাষ্ট্র খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, সে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবেও শক্তিশালী। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জাম, নারিকেল কিংবা লিচুর মতো ফলজ গাছ শুধু মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করে না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। গ্রামের বাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশ কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খালি জায়গাগুলোতে ফলজ গাছ লাগানো হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খাদ্য সংকটে ভুগবে না। তাই ফলজ গাছ রোপণ একটি জাতীয় দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
রাষ্ট্রীয়বাদী চিন্তায় বনজ গাছ রাষ্ট্রের পরিবেশগত নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের রক্ষক। বনভূমি একটি দেশের ফুসফুস হিসেবে কাজ করে। বনজ গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে বিশুদ্ধ রাখে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে। অথচ দুঃখজনকভাবে প্রতিনিয়ত বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ সংকেত। রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হলে বন রক্ষা করতে হবে, আর বন রক্ষার প্রথম ধাপ হলো বেশি বেশি গাছ লাগানো। তাই সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে প্রতিটি অঞ্চলে বনজ গাছ রোপণকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।
রাষ্ট্রীয়বাদী চেতনায় ঔষধি গাছ একটি দেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তুলসি, নিম, অ্যালোভেরা, বাসক, কালোজিরা কিংবা অর্জুন গাছ মানুষের রোগ প্রতিরোধে যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি ভেষজ চিকিৎসার গুরুত্বও দিন দিন বাড়ছে। একটি রাষ্ট্রের জনগণ সুস্থ থাকলে সেই রাষ্ট্র উন্নতির পথে দ্রুত এগিয়ে যায়। তাই প্রতিটি পরিবারে ঔষধি গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, যাতে দেশীয় ভেষজ সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়।
রাষ্ট্রীয়বাদী দায়িত্ব থেকে আমাদের মনে রাখতে হবে, গাছ কাটা মানে শুধু একটি বৃক্ষ ধ্বংস করা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া। গাছ কমে গেলে বৃষ্টিপাত কমে যায়, মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে এবং তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যায় এবং জনগণের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে অবৈধভাবে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে এবং ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা দিতে হবে। প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ দিবস পালন করা হলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম ও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। একটি গাছের প্রতি যত্ন নেওয়া মানে নিজের দেশকে ভালোবাসা এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করা।
রাষ্ট্রীয়বাদী সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নাগরিকদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু সরকার নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষকে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং তরুণ সমাজকে সমন্বিতভাবে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। কারণ একটি সবুজ রাষ্ট্রই একটি নিরাপদ ও উন্নত রাষ্ট্রের প্রতীক।
রাষ্ট্রীয়বাদী আদর্শ আমাদের শেখায়—দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের মাটি, প্রকৃতি ও পরিবেশকে ভালোবাসা। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ লাগাই এবং অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করি। আজকের একটি ছোট উদ্যোগই আগামী দিনের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি হতে পারে। সবুজে ঘেরা, দূষণমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই।