
দীর্ঘ ৫৮ বছর পর দেশে নির্মিত হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় খনিজ তেল শোধনাগার। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) প্রাঙ্গণেই তৈরি হবে দ্বিগুণ ক্ষমতার এই নতুন ইউনিট। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ স্থানীয়ভাবেই মেটানো সম্ভব হবে, যা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।
প্রকল্পটির মূল বাধা ছিল অর্থায়ন। গতকাল বৃহস্পতিবার ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের এক চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেই অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। আইডিবির দেওয়া ১০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে) ঋণ সহায়তায় এটি বাস্তবায়িত হবে। ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আইডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে এই ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান এবং আইডিবির পক্ষে কান্ট্রি প্রোগ্রামসের ডিরেক্টর জেনারেল আনাসি আইসামি চুক্তিতে সই করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বাংলাদেশে একটি নতুন সরকার এসেছে এবং দেশের একটি নতুন দিকনির্দেশনা রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা। এটি কোনো ফাঁকা স্লোগান নয়, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা। চলতি দশকের মধ্যেই রপ্তানি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতের মাধ্যমে আমরা অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে চাই।"
কর্মকর্তারা জানান, নিজস্ব অর্থায়নে এ ধরনের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে জাতীয় বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতো। তাই বিদেশি সহজ শর্তের ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
দেড় দশকের নানা চড়াই-উতরাই
১৯৬৮ সালে পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত দেশের একমাত্র সরকারি পরিশোধনাগার ইআরএল-এর বর্তমান বার্ষিক শোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। ধারণক্ষমতা দ্বিগুণ করতে ২০১২ সালে 'ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২' নামে প্রথম প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। তবে পরবর্তী দেড় দশকে অন্তত ১১ বার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি; বরং ধাপে ধাপে বাড়ানো হয় আনুমানিক ব্যয়।
২০২৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠী 'এস আলম গ্রুপ'-এর সঙ্গে যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিতর্কিত সেই চুক্তি বাতিল করে এবং প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে রাখে ‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইআরএল’। এরপর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে বিদেশি ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে রেখে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রকল্প অনুমোদনের ছয় মাসের মাথায় গত বুধবার জ্বালানি বিভাগের একজন যুগ্ম সচিবকে এই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
স্বস্তি প্রকাশ বিশেষজ্ঞদের
জ্বালানি খাতকে সম্পূর্ণ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার যে আলোচনা চলছিল, নতুন এই অর্থায়ন চুক্তির মাধ্যমে তার অবসান ঘটল বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
ভোক্তা অধিকার সংস্থা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এ বিষয়ে স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, "জ্বালানি তেল খাত বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় একটি আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। শোধনাগার নির্মাণে বিদেশি ঋণ নিশ্চিত হওয়ায় এ খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। এটি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অত্যন্ত স্বস্তির খবর। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, প্রকল্পটি যেন আর কোনো প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক জটিলতায় দীর্ঘসূত্রী না হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গুণগত মান বজায় রেখে সম্পন্ন হয়।"