তদন্তে মিলেছে কার্যক্রমহীন প্রতিষ্ঠান, অনিয়মের অভিযোগে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন
জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:
যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করা ২৮টি অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের অধিকাংশেরই বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই অথবা শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে আর্থিক লেনদেন এবং এমপিও আবেদনকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ ওঠার পর ২০১৯ সালে বিদ্যালয়গুলো সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আনা হয়। সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরিচালিত তদন্তে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার খেদাপাড়া ইউনিয়নের দিঘিরপাড় বাজারের দক্ষিণ পাশে ২০১৫ সালে টিনের বেড়া ও ছাউনি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় দিঘিরপাড় অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুল (নন-এনডিডি)। বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষকসহ ২৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ থেকে ২২ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীও ভর্তি করা হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিদ্যালয়টিকে সচল দেখিয়ে এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সেখানে কোনো বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নেই। বিদ্যালয়ের জায়গাজুড়ে এখন পাটক্ষেত দেখা যায়। প্রধান শিক্ষক নাজমুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
শ্যামকুড় ইউনিয়নের সুন্দলপুর বাজার এলাকায় প্রতিষ্ঠিত মাস্টার আবু হোসেন অটিস্টিক স্কুলেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হলেও বর্তমানে সেখানে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলুর রহমান স্বীকার করেন যে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
পৌর শহরের বাদামতলায় প্রতিষ্ঠিত সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খান টিপু সুলতানের নামে গড়ে ওঠা খান টিপু সুলতান অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী (এনডিডি) বিদ্যালয়েরও একই অবস্থা। ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হলেও বিদ্যালয়টির অস্তিত্ব কার্যত নেই বললেই চলে। প্রধান শিক্ষক সুকান্ত চক্রবর্তী জানান, ২০২২ সালে এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করা হয়েছিল, তবে বিভিন্ন কারণে বর্তমানে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
হরিদাসকাটি ইউনিয়নের পলাশপুর এসএম প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে জ্বালানি কাঠ মজুত করে রাখা হয়েছে। চারদিকে পানি আর কচুরিপানায় ঘেরা ভবনটিতে শিক্ষা কার্যক্রমের কোনো চিহ্ন নেই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উজ্জ্বল হাসান জানান, শিক্ষার্থী সংকটসহ নানা কারণে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
মণিরামপুর সদর ইউনিয়নের হাজরাকাটিতে অবস্থিত নিছার আলী মেমোরিয়াল অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। অথচ বিদ্যালয়টিতে ২৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান মিন্টু একই সঙ্গে কেশবপুর উপজেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
মনোহরপুর ইউনিয়নের মাস্টার ময়েজ উদ্দিন বিশ্বাস মেমোরিয়াল অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের অবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ। ভবনটি এখনও দাঁড়িয়ে থাকলেও সেখানে শিক্ষা কার্যক্রমের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ভবনটি বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে, উপজেলার বিভিন্ন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের সময় বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে। অনেক চাকরিপ্রত্যাশী ভবিষ্যতে এমপিওভুক্তির আশায় মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয় করে নিয়োগপত্র গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বার্তায় মনিরামপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দাইয়ান আমিন উল্লেখ করেন যে, অটিস্টিক বিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে উত্থাপিত অধিকাংশ অভিযোগের তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। একই বার্তায় তিনি বিদ্যালয়গুলোর তদন্তকে কেন্দ্র করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন। তবে তিনি কারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বা তদন্তে কী তথ্য উঠে এসেছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
উপজেলার সব অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দাইয়ান আমিন জানান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে পরিচালিত সরেজমিন তদন্তে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয়গুলোর বাস্তব অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন জানান, তদন্ত শেষে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর কার্যক্রমহীন অবস্থায় পড়ে থাকলেও কীভাবে এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করতে পেরেছে, কীভাবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং অভিযোগের পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এসব প্রশ্ন এখন স্থানীয় জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।