
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, একটি সমাজের আত্মা কেমন, তা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় সমাজটি তার শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে—তা দেখলে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে পেটের ভেতর প্রায় ৭ হাজার ইয়াবা বহন করে পাচারের সময় ৯ ও ১২ বছরের দুটি শিশুকে উদ্ধারের ঘটনা কেবল একটি অপরাধের সংবাদ নয়; এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের চরম পতনের নির্মম দলিল। যেসব কোমলমতি শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের শরীরকেই বানিয়ে দেওয়া হয়েছে মাদকের বাহন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন গবেষণা তথ্য বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী ১৫ বছর বা তার কম বয়সী শিশুরা মাদক বিক্রির সঙ্গে বিপজ্জনকভাবে জড়িয়ে পড়ছে। ১,৬০০ জন পথশিশুর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ২১ শতাংশ পথশিশুকে মাদক চোরাচালানে ব্যবহার করা হয়। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে অসাধু চক্র দারিদ্র্য ও অবহেলার সুযোগ নিয়ে একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
উন্নত বিশ্বে শিশুরা অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাদের কেবল অপরাধী বানিয়ে বিচার করা হয় না; বরং ‘চাইল্ড ক্রিমিনাল এক্সপ্লয়িটেশন’ কাঠামোর অধীনে দেখা হয় কারা তাদের বলির পাঁঠা বানাল। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষ করে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩৩ অনুচ্ছেদে শিশুদের মাদক চোরাচালান ও ব্যবহার থেকে রক্ষা করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ রয়েছে। অপরাধী চক্রগুলোকে বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষা ও সমাজসেবা বিভাগের যৌথ সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের চিহ্নিত ও সুরক্ষা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি।
পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নিজেদের এবং পরিবারকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে। কিন্তু আমরা অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা কিংবা তদারকির অভাবে শিশুদের অগ্নিকুণ্ডে ঠেলে দিচ্ছি। জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ট বলেছিলেন—‘শিশুদের প্রতি করা প্রতিটি অন্যায় সমগ্র মানবতার জন্যই এক কলঙ্ক।’ একটি শিশুর কোমল পেট মাদক পরিবহনের থলে নয়, তা স্বপ্নের বাসস্থান। সেই স্বপ্নকে ধ্বংস করা পুরো জাতির ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারে নিক্ষেপ করার নামান্তর।
| গবেষণার সূচক / খাত | পরিসংখ্যান ও বিবরণ |
|---|---|
| মাদক বেচাকেনায় মোট শিশুর অনুপাত | প্রায় ২৫ শতাংশ (বয়স ১৬ বছরের নিচে) |
| পথশিশুদের মাদকের বাহক হিসেবে ব্যবহার | ২১ শতাংশ পথশিশু সরাসরি চোরাচালানে নিয়োজিত |
| পথশিশুদের মাদকাসক্তির হার | ৫৮ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত |
| আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি | জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ - অনুচ্ছেদ ৩৩ (মাদক থেকে সুরক্ষা) |