
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণীর অন্তত ১৩ জন ছাত্রী গত দুই বছরে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তালা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের ডেকে মুচলেকা নেওয়াসহ তাদের পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে এক তলব সভায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন সাতক্ষীরা জেলা নারী বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার।
গোপনে ও জেলার বাইরে কাজী ডেকে বিয়ে
নারী বিষয়ক অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহে ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ১১ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরেজমিনে বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে, মোট ১৩ জন শিক্ষার্থীকে বাল্যবিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের তলব সভায় অভিযুক্ত ১৩ শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক এবং প্রধান শিক্ষককে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে আটজন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক উপস্থিত হন।
প্রশাসন জানায়, অভিভাবকেরা বিয়ের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। সাতক্ষীরার বাইরে থেকে বহিরাগত কাজীদের এনে গোপনে এই বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। বিয়ে হওয়া কয়েকজন ছাত্রী এরই মধ্যে স্বামীর সঙ্গে জেলার বাইরে পোশাক কারখানায় কাজ করতে চলে গেছে।
ইসলামকাটি ইউনিয়নের কাজী (সরকারি ম্যারেজ রেজিস্ট্রার) এই বিষয়ে অবহিত ছিলেন কি না এবং তাকে এড়িয়ে কীভাবে বহিরাগতদের মাধ্যমে বিয়ের আয়োজন হলো—তা জানতে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নারী বিষয়ক অধিদপ্তর।
অভিভাবকদের মুচলেকা ও তদারকি
ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তালেব জানান, "বিয়ে হওয়া আট শিক্ষার্থী এখনও নিয়মিত স্কুলে আসছে। বাকিরাও স্কুলে ফিরে আসবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।"
উপস্থিত আটজন অভিভাবকের কাছ থেকে একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা বা মুচলেকা নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। মুচলেকায় উল্লেখ রয়েছে—১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মেয়েরা বাবার বাড়িতেই অবস্থান করবে এবং নিয়মিত লেখাপড়া চালিয়ে যাবে।
তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল আফরোজ (স্বর্ণা) জানান, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা ও তাদের শিক্ষা তদারকির দায়িত্ব মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরায় আশঙ্কাজনক হারে বাল্যবিয়ে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিবিএস) এপ্রিল ২০২৪-এর 'স্মল এরিয়া এস্টিমেশন' প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের দিক থেকে সাতক্ষীরা জেলা অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। এই জেলায় ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বাল্যবিয়ের হার ৬২ শতাংশের বেশি।
শিশু বিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী, মেয়েদের ১৮ ও ছেলেদের ২১ বছরের নিচে বিয়ে দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি ২ বছরের কারাদণ্ড। আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে গোপনীয়তা রক্ষা করে বাল্যবিয়ে দেওয়ার এমন ঘটনা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে