
২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের সেই প্রাণঘাতী হামলার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৫ বছর। আল-কায়দার ছিনতাইকৃত বিমান থেকে শুরু হওয়া মার্কিন ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ পৃথিবীর মানচিত্র এবং লাখ লাখ মানুষের জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।
প্রতিটি বছর কোথাও না কোথাও বোমা বর্ষণ, নতুন নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পদার্পণ এবং দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের মধ্য দিয়ে কেটেছে এই দুই দশক। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠেছে এসেছে এই দীর্ঘ সংঘাতের প্রকৃত মানবিক মূল্য।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের 'কস্ট অব ওয়ার' (Costs of War) প্রজেক্টের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে ৪.৫ থেকে ৪.৭ মিলিয়ন (৪৫ থেকে ৪৭ লাখ) মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
প্রত্যক্ষ প্রাণহানি: আনুমানিক ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ সরাসরি হামলায় নিহত হয়েছেন।
পরোক্ষ প্রাণহানি: ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ চিকিৎসাভাব, অপুষ্টি ও নানা স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগে মারা গেছেন।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় উমর নামে ১৮ বছর বয়সী এক ছাত্রের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ। তিনি বলেন, “আমাদের বন্ধুদের অনেকেই দেখতে গিয়েছিল কী ঘটছে। তারা আর ফিরে আসেনি। সংঘাত সব কিছু বদলে দিয়েছিল।”
২০০১ সালের ৭ই অক্টোবর ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ নাম দিয়ে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করে মার্কিন বাহিনী। দুই দশকের এই দীর্ঘতম যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন আনুমানিক ১৭৬,০০০ মানুষ। পরবর্তীতে ২০২১ সালে তালেবানরা পুনরায় দেশটির ক্ষমতায় ফিরে আসে, তবে রেখে যায় চরম খাদ্যসংকট ও মাইনের ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ এক পরিবেশ।
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভুয়া অজুহাতে ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালায় ওয়াশিংটন। সেই হামলায় সরাসরি মারা গেছেন ৩ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ।
পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও সিরিয়ায় কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা না করেই শত শত বিমান ও ড্রোন হামলা চালানো হয়।
পাকিস্তান: ৪২৩টিরও বেশি ড্রোন হামলায় আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু।
ইয়েমেন ও সোমালিয়া: বেসামরিক নাগরিকসহ হাজার হাজার মানুষ এই গুপ্ত হামলায় প্রাণ হারান।
আইএসআইএল বিরোধী অভিযান: ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন অভিযানে ৮,০০০ থেকে ১৩,০০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ধারণা আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থাগুলোর।
যুদ্ধ ও সংঘাতের সরাসরি শিকার হয়ে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও সিরিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ। তারা নিজ দেশে বা অন্য দেশে শরণার্থী হিসেবে বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন।
“আমারা বহুবার দেশ ছেড়েছি এবং ফিরে এসেছি। শেষবার ১১ বছর ইরানে থাকার পর সেখান থেকেও আমাদের বের করে দেওয়া হয়েছে।” — আয়েশা, আফগান শরণার্থী
এই দীর্ঘ সংঘাত শুধুমাত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোরই ক্ষতি করেনি, যুক্তরাষ্ট্রকেও বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে।
আর্থিক ব্যয়: যুদ্ধের পেছনে সরাসরি ব্যয় হয়েছে ৫.৮ ট্রিলিয়ন (৫৮ লাখ কোটি) ডলার।
সৈনিকদের ভবিষ্যৎ চিকিৎসা: ফেরত আসা সেনাসদস্যদের স্বাস্থ্যসেবায় আরও ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে, যা মিলিয়ে মোট খরচ দাঁড়ায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে।
মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি: যুদ্ধে সরাসরি নিহতের চেয়ে চার গুণ বেশি মার্কিন সেনাসদস্য ও প্রবীণ যোদ্ধা পরবর্তীতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্টের পরিচালক স্টেফানি স্যাভেল বলেন, "অনেক সেনা কর্মকর্তা বারবার যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন, যা তাদের মধ্যে তীব্র মানসিক ট্রমা ও মানসিক রোগ (PTSD) তৈরি করেছে।"
২৫ বছর পরও এই 'চিরন্তন যুদ্ধ' (Forever War)-এর ঋণ ও মানবিক খেসারত দিতে হচ্ছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে।