
শাকবাড়িয়া নদীর ভাঁটার টানে কাদা থকথক করছে দুই কূলে। খালি পায়ে, হাতে ছোট একটি ছুরি নিয়ে নৌকায় চেপে সুন্দরবনের গহীনে পা বাড়ান ৪০ বছর বয়সী সুরঞ্জন রাপ্তান। বহু বছর ধরে এই বিশাল ম্যানগ্রোভ বনই ছিল তার 'ফার্মেসি' বা ওষুধের দোকান। কিন্তু ইদানীং বনে গিয়ে আগের মতো ভেষজ উদ্ভিদ খুঁজে পান না তিনি।
সুরঞ্জন একাই নন, জলবায়ু পরিবর্তন ও লোনা পানির প্রভাবে সুন্দরবনের পরিবেশব্যবস্থায় (ইকোসিস্টেম) যে চরম পরিবর্তন আসছে, তা কেবল প্রাকৃতিক ভারসাম্যই নষ্ট করছে না—ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছে উপকূলীয় এলাকার শত বছরের পুরনো লোকজ চিকিৎসা ঐতিহ্য।
সুন্দরবনের প্রায় ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে তিন শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নদী ও মাটিতে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
লবণাক্ততার ব্যাপক বৃদ্ধি: ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানির লবণাক্ততা ২১ থেকে বেড়ে ৩৩ পার্টস পার থাউজেন্ডে (ppt) পৌঁছায়। একই সাথে মাটির লবণাক্ততা প্রায় ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উদ্ভিদের সংকট: সুন্দরবনের প্রাণখ্যাত 'সুন্দরী' গাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। বাইন গাছের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ অনেক এলাকায় ফুল ফুটানো বন্ধ করে দিয়েছে।
অনুপস্থিত ভেষজ: হোগলা, বাইন, নিম, অশ্বগন্ধা এবং হরিতকীর মতো চিকিৎসায় ব্যবহৃত ভেষজগুলো এখন বনের ভেতরেও আর সহজে পাওয়া যায় না।
"লবণাক্ততা ধীরে ধীরে বনের রূপ বদলে দিচ্ছে। সহনশীল প্রজাতিগুলো টিকে থাকলেও, যে গাছগুলো চিকিৎসা ও মানুষের নিরাময়ে কাজ করত—সেগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।"
— অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রহিম, চেয়ারম্যান, জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

কয়রা এলাকায় একসময় বহু কবিরাজের বাস ছিল। সুরঞ্জনের মতে, তার বাবার আমলে এই এলাকায় ৮ থেকে ১০ জন সক্রিয় কবিরাজ ছিলেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২-৩ জনে।
৬৫ বছর বয়সী আরেক প্রবীণ কবিরাজ প্রভাত সরকার জানান, "আমি ৩৫ বছর ধরে এই কাজ করছি। কিন্তু আমার পর এই জ্ঞান নেওয়ার মতো কেউ নেই। এখনকার তরুণরা আর এই কঠিন শিক্ষায় আসতে চায় না।"
বাংলাদেশ জাতীয় হার্বেরিয়ামের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সরদার নাসির উদ্দিন বলেন, "আমাদের ঐতিহ্যের এই ভেষজ জ্ঞান লিখিতভাবে খুব কমই সংরক্ষণ করা হয়েছে। একজন কবিরাজের মৃত্যু মানে আক্ষরিক অর্থেই একটি লাইব্রেরি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া।"
উপকূলীয় এলাকায় আধুনিক চিকিৎসাসেবার বিকাশ এবং কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে ওঠায় আধুনিক ওষুধের ব্যবহার বেড়েছে। তবে এখনো অনেক দরিদ্র পরিবার প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য কবিরাজদের ওপরই ভরসা করে।
কয়রার স্থানীয় বাসিন্দা দীপা মণ্ডল (৩২) বলেন, "শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখানোর মতো টাকা আমাদের নেই। একটি প্রাইভেট ভিজিটেই ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয়ে যায়। কিন্তু সুরঞ্জন-দা কোনো টাকা দাবি করেন না। তাই আমরা যেকোনো সাধারণ অসুখে উনার কাছেই আগে ছুটি।"
জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক বা প্রাকৃতিক নয়, এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক সংকট। কবিরাজদের এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, তার সাথে সাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও স্মৃতির অংশও মুছে যাচ্ছে।
সুরঞ্জন রাপ্তান এখন নিজের উঠোনে সংগৃহীত বৃষ্টির পানি দিয়ে ছোট একটি ভেষজ বাগান বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু লোনা বাতাস আর ক্রমবর্ধমান উষ্ণতায় টবের চারাগুলোও প্রায়ই শুকিয়ে যায়।
প্রকৃতির পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের মাঝে দাঁড়িয়ে উপকূলের এই শেষ প্রজন্মের চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন—হয়তো আর কয়েক বছর পর সুন্দরবনের এই নিরাময়কারী গাছ ও হাজার বছরের ভেষজ জ্ঞানের কথা আর কারও মনে থাকবে না।