
দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বেড়ে ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২২ লাখ ১০ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন। সে হিসাবে সাত মাসের ব্যবধানে মজুত বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৪ মেট্রিক টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি মজুতের মধ্যে চাল ২০ লাখ ৩৬ হাজার ১০২ মেট্রিক টন, গম ২ লাখ ৩২ হাজার ১৮৩ মেট্রিক টন এবং ধান ৩৪ হাজার ৭০ মেট্রিক টন। ফ্লোটিং মজুতসহ মোট খাদ্যশস্যের পরিমাণ ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ফ্লোটিং মজুত হিসেবে গম রয়েছে ৬৮ হাজার ৭২৩ মেট্রিক টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন, সংগ্রহ, আমদানি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকায় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা বাড়বে।
এর আগে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট দেশে চাল ও গম মিলিয়ে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২১ লাখ ৩১ হাজার মেট্রিক টন। সে সময় চাল ছিল ১৯ লাখ ৫৪ হাজার টন এবং গম ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার টন। সেই হিসাবের তুলনায় বর্তমানে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বেড়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন।
২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনামূলক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে খাদ্যশস্যের সরকারি মজুত ছিল ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন। বর্তমান মজুতের সঙ্গে তুলনা করলে তা প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার টন বেশি।
বাড়ছে সংরক্ষণ সক্ষমতা
সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগে দেশের সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা ছিল প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে তা বেড়ে ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এই সক্ষমতা ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য মজুতের মানদণ্ডও বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনকে নিরাপদ মজুতের সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বিবেচনায় বর্তমানে ১৬ লাখ মেট্রিক টনকে নিরাপদ মজুতের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বোরো সংগ্রহে অগ্রগতি
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বোরো সংগ্রহ কার্যক্রমেও অগ্রগতি হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ধান ও চাল মিলিয়ে মোট ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ধান ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ মেট্রিক টন, সিদ্ধ চাল ১২ লাখ ১ হাজার ৫৬৮ মেট্রিক টন এবং আতপ চাল ১ লাখ ৫ হাজার ৩১৩ মেট্রিক টন সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫২৩ মেট্রিক টন গম সংগ্রহ করা হয়েছে।
খাদ্যশস্যের মজুত শক্তিশালী রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ৬৫ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে।
আমন নিয়ে আশাবাদ
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, জাতীয় চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যশস্যের মজুত ও সংরক্ষণ সক্ষমতা সমন্বয়ের লক্ষ্যে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, এবার দেশে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় আমন চাষে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের আশা করা হচ্ছে। ফলে বোরো মৌসুমের মতো আমন সংগ্রহেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জন হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গমের পরিবর্তে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে চাল ব্যবহারের বিকল্প পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। ফলে খাদ্য নিয়ে বর্তমানে কোনো সংকট বা সমস্যার আশঙ্কা নেই বলেও তিনি জানান।
খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংগ্রহ শাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চলতি মৌসুমে দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযান সফল ও সন্তোষজনকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
তিনি জানান, সরকারি খাদ্যগুদামগুলোতে বর্তমানে চাল ও গমের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এই মজুত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন বলেন, দেশের বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক। সরকারি খাদ্যগুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুত রাখার পাশাপাশি সঠিক সংরক্ষণ ও খাদ্যের গুণগত মান বজায় রাখায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মতো সরকারি খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম সচল রাখতে গুদাম থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।
জামাল হোসেন জানান, সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বর্তমানে ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে তা ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বিবেচনায় নিরাপদ খাদ্য মজুতের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হয়েছে।