
আমরা সাধারণত মনে করি যেকোনো সংক্রমণ বা ইনফেকশন বাইরে থেকে আসা কোনো ক্ষতিকর জীবাণুর কারণে হয়। কিন্তু স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, বড় ধরনের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে আমাদের শরীরের ভেতরেই বছরের পর বছর বসবাস করা কিছু অণুজীব।
মানুষের শরীর কোটি কোটি অনুজীবের এক বিশাল বাসস্থান—যার মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ও ভাইরাস। এগুলোকে একত্রে বলা হয় 'মাইক্রোবায়োম' (Microbiome)। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা ক্ষতিকর নয়, বরং খাবার হজম করা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং ক্ষতিকর জীবাণুকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।
তবে এই স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় না থাকলে শরীরের ভেতরে থাকা এসব ‘বন্ধুভাবাপন্ন’ অনুজীব সুযোগ পেলেই মারাত্মক সংক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়—যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'অপরচুনিস্টিক প্যাথোজেন' (Opportunistic pathogens)।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে এই অনুজীবগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

আমাদের অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে বাস করে ই কোলাই (Escherichia coli) নামের একটি ব্যাকটেরিয়া, যা পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই ব্যাকটেরিয়াই যদি মূত্রনালীতে প্রবেশ করে, তবে ইনফেকশন তৈরি করে।
অতীতে এসব সংক্রমণ সহজেই ওষুধ দিয়ে নিরাময় করা যেত। কিন্তু বর্তমানে ই কোলাই-এর একাধিক স্ট্রেন প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
জার্নাল 'দ্য ল্যানসেট'-এ ২০২২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে ছয়টি প্রধান জীবাণুর কারণে অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্সজনিত প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একক উপাদান হিসেবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল এই ই কোলাই।
একই কথা প্রযোজ্য ক্যানডিডা (Candida) নামক ফাঙ্গাসের ক্ষেত্রেও। এটি আমাদের মুখ ও পরিপাকতন্ত্রে শান্তভাবে বাস করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, ক্যানসারের চিকিৎসা বা অন্য কোনো অসুস্থতায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে।
এ ছাড়া আমাদের ত্বক ও নাকের ভেতরে থাকা স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস (Staphylococcus aureus) ব্যাকটেরিয়াও একই প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্যান্ট হয়ে উঠে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তুলছে।
অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।
যখনই প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা হয়, ভুল নিয়মে খাওয়া হয় বা কোর্স শেষ করার আগেই খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখনই ব্যাকটেরিয়া ওষুধ এড়ানোর উপায় শিখে ফেলে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে যা ওষুধকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
সহজ কথায়, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খেয়ে আমরাই আমাদের শরীরের অণুজীবগুলোকে ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিদিনের জীবনে এই চিত্র নিয়মিত দেখা যায়। শিশু বা বয়স্কদের জ্বর-সর্দি হলেই চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়ানো হয়। অথচ সর্দি-জ্বর সাধারণত ভাইরাসের কারণে হয়, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজেই আসে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, অ্যান্টিবায়োটিকের এমন অপব্যবহারই বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলে:
সাধারণ ইনফেকশনেও হাসপাতালে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
চিকিৎসার খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের হাতে কার্যকর ওষুধের বিকল্প কমে আসে।
আধুনিক চিকিৎসার ভিত্তি—যেমন জটিল অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের কিমোথেরাপি, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (ICU) এবং নবজাতকের নিবিড় যত্ন—সবই নির্ভর করে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর। ওষুধ কাজ না করলে এসব চিকিৎসাব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সমাধান কিন্তু শরীরের ভেতরের সব অণুজীব ধ্বংস করা নয়, কারণ তাদের অধিকাংশই আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানবদেহের স্বাভাবিক অণুজীবের ভারসাম্য রক্ষা করা।
এর জন্য প্রয়োজন:
অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল সেবন ও বিক্রি বন্ধে কঠোর নজরদারি।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়ার প্রবণতা রোধ করা।
হাসপাতাল ও সাধারণ পর্যায়ে সংক্রমণ প্রতিরোধের সঠিক উপায় মেনে চলা।
ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা।
করোনা মহামারির মতো কোলাহল না থাকলেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বলা হচ্ছে একটি 'নীরব মহামারি' (Silent Pandemic)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে মানবজাতির জন্য শীর্ষ ১০টি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য হুমকির একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আমাদের শরীরের ক্ষুদ্র প্রতিবেশী অনুজীবগুলো আমাদের সুহৃদ থাকবে নাকি প্রাণঘাতী শত্রু হয়ে উঠবে—তা নির্ভর করছে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে আমাদের আজকের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর।