
একটি শিশু সুস্থ করার আশায় হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি, তারপর কেবলই নিস্তব্ধতা। গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে রাজধানী ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে (আইডিএইচ) মাত্র এক বছর বয়সী শিশু সাইফ হাসানকে যখন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়, তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
শরীয়তপুর থেকে আসা শিশুটির গায়ে কিছু দিন আগেই ছিল প্রচণ্ড জ্বর ও লালচে ফুসকুড়ি। প্রথমবার হামের টিকা নেওয়ার পরেই সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বলে পরিবার ভেবেছিল। তবে চিকিৎসকেরা জানান, টিকা কাজ শুরু করার আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছিল সাইফ, যা পরবর্তীতে তার আগের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
সাইফের এই করুণ পরিণতি মূলত বাংলাদেশে চলমান ভয়াবহ হাম মহামারীর এক বাস্তব চিত্র। সরকারি হিসাবে, চলতি বছরের মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে ইতোমধ্যে ১,০০৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে (১০০ জন ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত এবং ৯০৯ জন সন্দেহভাজন)। অথচ আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে দেশজুড়ে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩২ এবং মৃত্যু ছিল শূন্য।
মহামারী ঠেকাতে এপ্রিল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি (১৯.৭৫ মিলিয়ন) শিশুকে হামের বিশেষ টিকা দেওয়া হয়েছে। ১৮ মিলিয়নের লক্ষ্যমাত্রা ছাপিয়ে এই রেকর্ড সংখ্যক টিকাদানের পরও কেন থামানো যাচ্ছে না মৃত্যু—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধান বাধা ছিল শুরুতে টিকাদানের প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রা কম ধরা এবং জাতীয় হারের অন্তরালে নির্দিষ্ট অঞ্চলের দুর্বলতা ঢাকা পড়ে যাওয়া।
বাংলাদেশ সরকারের ২০২৩ সালের 'কভারেজ ইভালুয়েশন সার্ভে' অনুযায়ী:
২০১৯ সালে প্রথম ডোজের হার ছিল ৮৮.৬%, যা ২০২৩ সালে কমে দাঁড়ায় ৮৬%-এ।
দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৯% থেকে নেমে ৮০.৭%-এ দাঁড়ায়।
কভিড-১৯ মহামারীর সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়। এর ওপর বিভ্রান্তিকর তথ্য ও টিকা নিয়ে মানুষের অনিচ্ছাও প্রভাব ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে যেখানে ৯৫% কভারেজ প্রয়োজন, সেখানে পরপর কয়েক বছর কভারেজ কমে যাওয়ায় বিপুল সংখ্যক শিশু ঝুঁকিতে রয়ে যায়।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতির কারণে। ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন জানান, তৎকালীন সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক অস্থিরতায় টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হয়, যার ফলে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে দেশে টিকাসংকট তৈরি হয়।
এরপর ২০২৬ সালের শুরু থেকে সংক্রমণ বাড়তে থাকে এবং এপ্রিলে দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান শুরু হয়। তখন ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১৮ মিলিয়ন শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। অথচ এর দুই মাস পর, জুনে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর অভিযানে একই বয়সী শিশুর সংখ্যা দেখা যায় প্রায় ২৪ মিলিয়ন—অর্থাৎ টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রায় প্রায় ৬০ লাখ শিশুর হিসাব বাদ পড়ে গিয়েছিল।
ড. মুশতাক বলেন, "জাতীয় গড় ৯৫% থাকলেও যদি কোনো নির্দিষ্ট পকেটে বা ভাসমান জনগোষ্ঠীর মাঝে টিকাদানের হার কম থাকে, তবে সেখানেই ভাইরাসের বিস্তার ঘটে।"
আইডিএইচ-এর পরিসংখ্যান বলছে, ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ৩,১৬৭ জন সন্দেহভাজন ও ৫৩৭ জন নিশ্চিত হামের রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করা ৫৭ জনের ডেটা বিশ্লেষণ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে:
৮৬ শতাংশ (৪৯ জন) শিশুর বয়স ছিল ১৫ মাসের কম।
৫৪ শতাংশ (৩১ জন) শিশুর বয়স ছিল ৯ মাসের নিচে—যা বাংলাদেশে শিশুদের হামের প্রথম ডোজ দেওয়ার নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম।
মোট মৃতের ৮৩ শতাংশের কোনো টিকা নেওয়া ছিল না এবং নিউমোনিয়া ছিল তাদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান জটিলতা।
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল জানান, নির্ধারিত বয়সের আগেই হামে আক্রান্ত হওয়া শিশুদের নিয়ে চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ, তাদের এখনো টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি।
ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (ডিজিএইচএস)-এর রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ড. হালিমুর রশীদ জানিয়েছেন, সংক্রমণ রুখতে পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে টিকাদানের আরও একটি পর্যায় শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল টিকাদানের সংখ্যা বাড়িয়ে এটি থামানো যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ('মাইক্রো-প্ল্যানিং')।
অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, হামের এই প্রাদুর্ভাব রুখতে অনেক স্থানে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদেরও টিকা কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, এই সরকারি পরিসংখ্যানের ঘাটতি ও বাস্তবতার মাঝেই ঝরে যাচ্ছে কিশোরগঞ্জের ৯ মাস বয়সী শিশু মোস্তাকিমের মতো অসংখ্য প্রাণ, যাদের বাঁচানো হয়তো সম্ভব ছিল।