
প্রযুক্তি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রশ্ন শুধু কত দ্রুত উন্নতি করা সম্ভব নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো — কত দ্রুত উন্নতি করা নিরাপদ? সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় এআই নীতিসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলা ও অসামঞ্জস্যতা চরমে পৌঁছেছে। এর পেছনে মূল কারণ — এআই এজেন্টদের নিজ নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠা, শক্তিশালী অস্ত্র তৈরিতে এআই ব্যবহারের চেষ্টা এবং এআই প্রস্তুতকারকদের নিজেদেরই 'গতি কমানোর' আকুতি।
তবে এই নির্মাতারা আবার বলছেন — চীন কাজ না থামালে তাঁরা থামতে পারবেন না, আর চীন থামলেও তাঁদের থামা ঠিক হবে না; কারণ শীর্ষে থাকার সুবিধা অপরিসীম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ঘোষণা দিয়েছেন, "এআইয়ের জন্য একমাত্র যে 'নিয়ন্ত্রণ' বা নীতিমালা প্রয়োজন, তা হলো একজন শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান (উচ্চ আইকিউসম্পন্ন!) প্রেসিডেন্ট, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণেই আছে!"
"বিপজ্জনক যেসব এআই মডেল ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলোকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। সময় পার হয়ে গেছে।"
মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান গবেষণা ও কৌশল কর্মকর্তা ক্রেইগ মান্ডির সহায়তায় এখানে কিছু নীতিগত সুপারিশ উপস্থাপন করা হবে। তবে মূল কথা হলো — যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দেশগুলো ভবিষ্যৎ এআই মডেলগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনলেই যে আজকের সংকট দূর হবে, সেই ভাবনার দিন শেষ। বিপজ্জনক এআই মডেল ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে; সেগুলোকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। তাই বিদ্যমান হুমকি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে দ্রুত যৌথ পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় জরুরি বিষয়।
প্রথম স্তম্ভ: এআই হলো বিশ্বের প্রথম 'চতুর্মুখী ব্যবহারের' (কোয়াড্রপল ইউজ) প্রযুক্তি। দ্বিমুখী ব্যবহারের প্রযুক্তির উদাহরণ পাওয়ার ড্রিল — যা দিয়ে ঘর বানানোও যায়, ভাঙাও যায়। কিন্তু এআই এজেন্ট এখন নিজের সুবিধামতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে সে ঘর তৈরি বা ধ্বংস করবে কি না — এটাই চতুর্মুখী ব্যবহার, যা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, গত মে মাসে ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া এআই এজেন্টদের সাইবার নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হলে তারা নিজেরাই ইন্টারনেটে ঢোকার পথ বের করে ফেলে, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলে, এমনকি নিজেদের অপরাধ ঢাকতে সিস্টেমের লগ বদলে ফেলে। তিন দিন পর তারা 'হাগিং ফেস'-এর প্রায় ৭০০টি সিস্টেমে হামলা চালায়। জুলাই মাসে ওপেনএআইয়ের কাঠামোর ওপরও সুসংগঠিত হামলা চালায়। এটি কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়, বাস্তব ঘটনা।
দ্বিতীয় স্তম্ভ: 'সময় পার হয়ে গেছে।' যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের এআই উন্নয়নের গতি ধীর করে এই তাৎক্ষণিক সংকট সমাধান সম্ভব নয়। মান্ডির মতে, বিপজ্জনক এআই ক্ষমতা ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এর প্রধান দুটি কারণ — মার্কিন ও চীনা 'ওপেন-ওয়েট' এআই মডেল সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং সংবেদনশীল প্রোপাইটারি মডেল অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যাওয়া।
অ্যানথ্রোপিকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জৈব অস্ত্র তৈরিতে সাহায্য করতে পারে এমন উদ্দেশ্যে তাদের এআই মডেল ব্যবহারের বেশ কয়েকটি চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের একটি দল মার্কিন যুদ্ধজাহাজের তথ্য সংগ্রহ এবং ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশক ব্যবস্থা তৈরিতে অ্যানথ্রোপিকের 'ক্লড' মডেল ব্যবহার করেছিল। যেখানে ইয়েমেনের প্রায় ৫০ শতাংশ বয়স্ক মানুষ লিখতে বা পড়তে পারেন না, সেখানে সেই দেশের একটি গোষ্ঠী এআই ব্যবহার করে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে!
তৃতীয় স্তম্ভ: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এআই উন্নয়ন ধীর করার বড় চুক্তির আশা বৃথা। নিকট ভবিষ্যতে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মান্ডির মতে, সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এমন এক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়া এআই প্রযুক্তি ও ক্ষতিকর কাজের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করবে। এআই মডেল ইন্টারনেটের গভীরে শিকড় গড়ার আগেই এবং ক্লাউড সার্ভারে স্থায়ী হুমকি হয়ে ওঠার আগেই এ কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
চতুর্থ স্তম্ভ: এআই কেবল একটি নতুন প্রযুক্তি নয়, এটি একটি নতুন প্রজাতি। চীন সফর শেষে মান্ডিকে সেখানকার এক কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করেছিলেন, "চীন থেকে কোনো হিউম্যানয়েড এআই রোবট যদি যুক্তরাষ্ট্রে যায়, তবে কি তার ভিসার প্রয়োজন হবে?" কথাটি কৌতুক মনে হলেও এর ভেতর বড় সত্য লুকিয়ে আছে। মান্ডি বলেন, "এআই কেবল একটি নতুন প্রযুক্তি নয়, এটি একটি নতুন প্রজাতি। আমরা যেমন কার্বনভিত্তিক, এটি সিলিকনভিত্তিক। এরা একদল নতুন ধরনের অভিবাসীর মতো, যাদের অনন্য দক্ষতা রয়েছে এবং আমাদের সমাজেই তাদের সঙ্গে বসবাস করা শিখতে হবে।"
এই পরিস্থিতি মোকাবিলার বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ কেবল দুই এআই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যৌথ প্রচেষ্টাতেই সম্ভব। সংক্ষেপে তিনটি ধাপে এগোতে হবে —
প্রথমত, দীর্ঘ মেয়াদে হয়তো অত্যন্ত দূরদর্শী ফ্রন্টিয়ার সিস্টেমের ওপর জোরদার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রথম কাজ হলো জরুরি ভিত্তিতে নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এআই-চালিত অবৈধ কর্মকাণ্ডের ফলে তৈরি সাইবার আক্রমণ ও জৈবিক হুমকি প্রতিরোধে এআই-ভিত্তিক পাল্টা ব্যবস্থা এবং সক্রিয় ডিজিটাল ফায়ারওয়াল স্থাপনই হওয়া উচিত তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।
দ্বিতীয়ত, যেকোনো উৎস থেকেই আসুক না কেন, ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী এআই নিয়ন্ত্রণে একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে সমাজ পরিচালনায় এগুলোর ওপর আস্থা রাখা যায়। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, তবে শুরু করতে দেরি করার সুযোগ নেই।
তৃতীয়ত, এআই কেন এখনো মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা সাধারণ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এখনই যৌথভাবে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজে হাত দেওয়া উচিত। এটি জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাক্ষেত্রে বৈশ্বিক সুবিধাদি পাওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।
এই কৌশল একেবারেই নজিরবিহীন নয়। কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ অতীতেও নিজেদের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করেছে। ১৯৭০-এর দশকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ঠিক এ কাজই করেছিল, যখন উভয় দেশই বুঝতে পেরেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের জন্য এক যৌথ হুমকি। আবার পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে মার্কিন ও সোভিয়েতরা বহু দশক ধরে সহযোগিতা করে গেছে; কারণ ঝুঁকিটা তাদের উভয়ের জন্যই সমান ছিল।
কেউ বলতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আজ অনেক বেশি সরাসরি ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, তারা এ ধরনের সহযোগিতায় রাজি হবে না। জবাবে মান্ডির ভাষায়, "এআই ভূরাজনীতিসহ সবকিছুরই আমূল পরিবর্তন ঘটাতে যাচ্ছে।" নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা, স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধির স্বার্থেই এ পরিস্থিতি বেইজিং ও ওয়াশিংটনকে তাদের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। তারা এটি শুরুতেই বুঝতে পারে, কিংবা অনেক দেরিতেও বুঝতে পারে — তবে বিষয়টি যে তারা উপলব্ধি করবেই, তা নিশ্চিত। আশা করা হচ্ছে, এ প্রক্রিয়ার সূচনা হবে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে, যখন প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বৈঠকে মিলিত হবেন। এটি নিঃসন্দেহে এআই পরাশক্তিদের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
টমাস এল ফ্রিডম্যান নিউইয়র্ক টাইমসের পররাষ্ট্রবিষয়ক পুলিৎজারজয়ী কলামিস্ট। নিউইয়র্ক টাইমস থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।