স্পোর্টস ডেস্ক, টাচবাংলাদেশ
তারিখ: ২১ মে, ২০২৬
'জোগো বোনিতো' বা সুন্দর ফুটবলের সমার্থক শব্দ ব্রাজিল। পেলে, গারিঞ্চা থেকে শুরু করে রোনালদো, রোনালদিনহো কিংবা নেইমার—ব্রাজিল মানেই ছিল ফুটবলের জাদুকরী প্রদর্শনী। সবুজ গালিচায় তাদের সাম্বা ছন্দ দেখার জন্য বুঁদ হয়ে থাকত পুরো বিশ্ব। কিন্তু পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আজ এ কী দশা! টানা ব্যর্থতা, কোপা আমেরিকা কিংবা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ধুকতে থাকা সেলেসাওদের দেখে একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরেফিরে আসছে— ব্রাজিলের সোনালী দিন কি সত্যিই শেষ?
ফুটবলের এই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির পতনের পেছনে শুধু প্রতিভার অভাব নয়, বরং পুরো ইকোসিস্টেমের এক আমূল পরিবর্তন দায়ী। চলুন গভীর বিশ্লেষণে দেখে নিই ঠিক কী কারণে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল।
১. ২০১৪ বিশ্বকাপের '৭-১'-এর সেই দগদগে ক্ষত (Collective Trauma):
ব্রাজিলের বর্তমান পতনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে ২০১৪ সালের ৮ জুলাই, বেলো হরিজন্তের সেই কালো রাতে। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক ও বিভীষিকাময় হার দলটির মনস্তত্ত্বে এক গভীর 'কালেক্টিভ ট্রমা' বা সামষ্টিক ক্ষত তৈরি করেছে। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই ট্রমা থেকে তারা আজও পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। বড় মঞ্চে এলেই যেন সেই দুঃস্বপ্ন তাড়া করে ফেরে সেলেসাওদের।
২. হারিয়ে যাচ্ছে 'স্ট্রিট ফুটবল' বা অলিগলির সাম্বা ছন্দ:
একসময় ব্রাজিলের বস্তি বা ফ্যাভেলাগুলোর ধুলোমাখা রাস্তায় জন্ম নিত বিশ্বমানের সব প্রতিভা। খালি পায়ে বল নিয়ে কারিকুরি করতে করতেই তৈরি হতো তাদের সহজাত 'জিঙ্গা' বা জাদুকরী শৈলী। কিন্তু দ্রুত নগরায়ন এবং প্রযুক্তির বিকাশে সেই রাস্তার ফুটবল আজ মৃতপ্রায়। এখনকার তরুণরা বেড়ে উঠছে ঝা-চকচকে একাডেমির কৃত্রিম টার্ফে, যেখানে সৃষ্টিশীলতার চেয়ে শেখানো হয় যান্ত্রিক হিসাব-নিকাশ। ফলে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেই সহজাত সৌন্দর্য আর প্রেডিক্ট করা যায় না এমন আনপ্রেডিক্টেবল মুভমেন্ট হারিয়ে ফুটবল হয়ে পড়েছে অনেক বেশি রোবোটিক।
৩. সিবিএফ (CBF)-এর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা:
মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনীতি ব্রাজিলের ফুটবলকে বেশি ধ্বংস করেছে। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (CBF) লাগামহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং স্পনসরশিপ (যেমন নাইকি ডিল) চুক্তিতে চরম অনিয়ম দলটির মূল কাঠামোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিয়েছে। যোগ্য প্রশাসকের অভাবে ফুটবলের উন্নয়নের বদলে কর্তাব্যক্তিদের পকেট ভারী করার প্রতিযোগিতাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. এক্সপোর্ট প্যারাডক্স বা প্রতিভা পাচারের ফাঁদ:
ব্রাজিল এখন বিশ্ব ফুটবলের সেরা প্রতিভা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই কারখানার পণ্যগুলো নিজেদের দেশে পরিপক্ব হওয়ার আগেই বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ১৯-২০ বছর বয়সেই ভিনিসিয়ুস, রদ্রিগো বা এনড্রিকের মতো তরুণরা পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে। সেখানে গিয়ে তারা ইউরোপীয় ট্যাকটিকস এবং সিস্টেমে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন যে, জাতীয় দলে ফিরে তারা আর নিজেদের সেই স্বাধীন ব্রাজিলিয়ান ধাঁচে খেলতে পারছেন না। এটি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের জন্য এক বিশাল 'এক্সপোর্ট প্যারাডক্স'।
৫. পরিচয় সংকট ও কোচিং প্যানেলের ব্যর্থতা (Identity Crisis):
ব্রাজিল সবসময় তাদের নিজস্ব আক্রমণাত্মক স্টাইলে খেলতে অভ্যস্ত। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে তারা এখন ইউরোপীয় ফুটবলের অন্ধ অনুকরণ করতে চাইছে। ঘন ঘন কোচ বদল এবং ট্যাকটিকাল পরীক্ষার নামে তারা তাদের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী স্টাইল বিসর্জন দিচ্ছে। ইউরোপিয়ান সিস্টেমের ছাঁচে নিজেদের ফেলতে গিয়ে ব্রাজিল এখন না পারছে ইউরোপের মতো খেলতে, না পারছে নিজেদের সাম্বা ছন্দ ধরে রাখতে।
ব্রাজিলের বর্তমান সমস্যা কোনো একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের নয়, পুরো ফুটবল ইকোসিস্টেমের ব্যর্থতা। যদি তারা নিজেদের শেকড়ে ফিরে গিয়ে সেই হারানো 'জিঙ্গা' পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তবে ফুটবলের এই সর্বশ্রেষ্ঠ পরাশক্তির পতন ঠেকানো হয়তো অসম্ভবই হয়ে পড়বে।
(এই প্রতিবেদনের ধারণা ও বিশ্লেষণ সংগৃহীত হয়েছে বিশেষ তথ্যচিত্র: The Fall of Football's Greatest Nation Brazil থেকে)