স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল
বাংলাদেশ আবারও পাসপোর্টে “This passport is valid for all countries of the world except Israel” বা “ইসরায়েল ব্যতীত” বাক্যটি ফিরিয়ে আনার পথে হাঁটছে। এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে আবেগের জায়গা থেকে গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন প্রশ্নাতীত। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল আবেগ দিয়ে হয় না; সেখানে কূটনীতি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং নাগরিক স্বার্থের জটিল সমীকরণ কাজ করে।
একটি উন্নয়নশীল দেশের রাণী হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এমন প্রতীকী নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন।
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি আরও গভীরভাবে দেখা প্রয়োজন। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পাসপোর্ট কেবল একটি ভ্রমণ দলিল নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের পরিচয়, কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈশ্বিক অবস্থানের প্রতীক। সেই জায়গা থেকে “ইসরায়েল ব্যতীত” শব্দবন্ধ পুনঃসংযোজন বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তাকে সংকীর্ণ ও প্রতীকনির্ভর করে তুলতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা হলো—রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের স্বার্থ রক্ষা করা। রাষ্ট্র কোনো মতাদর্শিক আন্দোলনের প্রতিনিধি নয়; বরং নাগরিকের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যম। সেই জায়গা থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে: পাসপোর্টে এই নিষেধাজ্ঞামূলক বাক্য যুক্ত করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কী বাস্তব সুবিধা দিচ্ছে? বরং আন্তর্জাতিক চলাচল, কূটনৈতিক নমনীয়তা এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার জায়গায় একটি অপ্রয়োজনীয় প্রতীকী বাধা তৈরি করছে।
রাষ্ট্রীয়বাদী দৃষ্টিতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কখনো নিজেকে অযথা সীমাবদ্ধ করে না। উন্নত প্রথম সারির দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়—প্রত্যেক রাষ্ট্রই নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেও বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদর্শ ও স্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখাই আধুনিক রাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশের তালিকায় জায়গা করে নেবে। উন্নয়নশীল অর্থনীতি থেকে একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হতে চায়, তাহলে তাকে আবেগের চেয়ে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও কৌশলগত বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রের মর্যাদা আসে তার আত্মবিশ্বাস থেকে। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র নিজের নাগরিককে কোথায় যেতে পারবে বা পারবে না, সেই বার্তা পাসপোর্টে লিখে দিতে বাধ্য হয় না। বরং আইন, কূটনীতি ও প্রশাসনিক নীতিমালার মাধ্যমে বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ যখন ই-পাসপোর্ট থেকে “except Israel” বাক্যটি সরিয়ে দেয়, তখনও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল ভ্রমণ অনুমোদন করেনি। অর্থাৎ সরকারের চৌকসতায় রাষ্ট্র তার অবস্থান বজায় রেখেও একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কূটনৈতিক ভাষা গ্রহণ করেছিল। সেটিই ছিল আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রচিন্তার প্রকাশ।
রাষ্ট্রীয়বাদী বিশ্লেষণে আরও একটি বাস্তবতা সামনে আসে—বিশ্বব্যবস্থা এখন আন্তঃনির্ভরশীল। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, কৃষি, চিকিৎসা, সাইবার নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক যোগাযোগ অপরিহার্য। ইসরায়েল বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র, এবং তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গেও বাংলাদেশের বিস্তৃত অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে প্রকাশ্য প্রতীকী বৈরিতা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি করতে পারে। একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য এটি কৌশলগতভাবে লাভজনক নয়।
রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও মানবিক অবস্থান এক জিনিস নয়। বাংলাদেশ যেকোনো দেশের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতেই পারে, নেওয়া উচিতও। এগুলোর পেছনে থাকে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক চাপ, মানবিক সহায়তা ও বৈশ্বিক জনমত তৈরি—পাসপোর্টে প্রতীকী নিষেধাজ্ঞা লিখে নয়। কারণ শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের অবস্থান কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ করে, প্রতীকী বাক্যের মাধ্যমে নয়।
বাংলাদেশ গত এক দশকে নিজেদের একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। রপ্তানি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি—সবকিছুতেই আমরা বিশ্ববাজারের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে চাইছি। এই সময়ে পাসপোর্টে রাজনৈতিক বার্তা সংযোজন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বিপরীত সংকেত দেয়। এটি বিশ্বকে বোঝায়—বাংলাদেশ এখনো আবেগপ্রবণ প্রতীকী রাজনীতির জায়গা থেকে বের হতে পারেনি।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বিশ্বের বহু উন্নত দেশের। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বড় অংশ, এমনকি এশিয়ার অনেক উন্নত অর্থনীতিও ইসরায়েলের কৌশলগত মিত্র। বাংলাদেশ যদি প্রকাশ্যভাবে এমন একটি বার্তা বহন করে, তাহলে পরোক্ষভাবে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে প্রতীকও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হবেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রবাসীরা। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের অনেক সময় ট্রানজিট, চাকরি, বহুজাতিক কোম্পানির কাজ কিংবা গবেষণার প্রয়োজনে জটিল কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। পাসপোর্টে এমন নিষেধাজ্ঞা থাকলে অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, অতিরিক্ত নজরদারি কিংবা ভ্রমণ জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্ব যখন সীমান্ত সহজ করার কথা বলছে, তখন বাংলাদেশ নিজের নাগরিকদের জন্য নতুন মানসিক ও প্রশাসনিক বাধা তৈরি করছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যত প্রতীকী। কারণ কোনো দেশের পাসপোর্টে “অমুক দেশে বৈধ নয়” লেখা থাকলেও, সেই গন্তব্য দেশ চাইলে ভিসা দিতে পারে। অর্থাৎ এটি মূলত পাসপোর্ট প্রদানকারী দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের একটি পদ্ধতি মাত্র। বাস্তব কূটনৈতিক সম্পর্কের নির্ধারক নয়।
বিশ্বে এমন উদাহরণ নতুন নয়। পাকিস্তানের পাসপোর্টে এখনো লেখা থাকে “Valid for all countries except Israel”। লিবিয়া ও মালয়েশিয়াতেও দীর্ঘদিন একই ধরনের বিধিনিষেধ ছিল। বাংলাদেশের পাসপোর্টেও একসময় এই বাক্যটি ছিল, যা ২০২১ সালে নতুন ই-পাসপোর্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ সরকার তখনও ইসরায়েল ভ্রমণ অনুমোদন করেনি। অর্থাৎ বাক্যটি বাদ দেওয়ার অর্থ ছিল না যে বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলেছে; বরং এটি ছিল একটি আধুনিক, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পাসপোর্ট ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার অংশ।
অতীতেও বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক কারণে এমন নিষেধাজ্ঞা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিশেষ অনুমতি ছাড়া উত্তর কোরিয়া ভ্রমণ নিষিদ্ধ। ভারত একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপার্টহাইডবিরোধী অবস্থানের কারণে সেখানে ভ্রমণে সীমাবদ্ধতা দিয়েছিল। কমিউনিস্ট যুগে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড বা সোভিয়েত ইউনিয়নের নাগরিকদের পশ্চিমা দেশে যেতে আলাদা অনুমতি লাগত। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে—বিশ্ব যত উন্মুক্ত হয়েছে, ততই রাষ্ট্রগুলো নাগরিকদের চলাচলের স্বাধীনতা বাড়িয়েছে, সংকুচিত করেনি।
বাংলাদেশ কি তাহলে উল্টো পথে হাঁটছে?
যেকোনো দেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং মানবিক সংহতি প্রকাশ অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সেই অবস্থান হওয়া উচিত কার্যকর কূটনীতি, আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয়তা এবং মানবিক সহায়তার মাধ্যমে। পাসপোর্টে একটি প্রতীকী বাক্য যোগ করে বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতা বদলানো যাবে না। বরং এতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং নাগরিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
উন্নয়নশীল বাংলাদেশকে আজ প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসী ও বাস্তববাদী কূটনীতি—প্রতীকী দেয়াল নয়।
লেখক: স্পীন ডক্টর ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেল (সিইও, প্রতিষ্ঠাতা: বাংলাদেশ সাপোর্টার্স ফোরাম)
[বি.দ্র. : এটি কারো প্রতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মতামত রয়েছে। রাষ্ট্রীয়বাদী ক্লিন্টন হাওলাদার পাভেলের নিজস্ব মতের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। ]